পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের বিষয়ে গঠিত ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালের একটির দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি পদত্যাগের ইচ্ছা জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কর্মরত অবস্থায় তিনি দিনে গড়ে মাত্র ১০টি আপিলের শুনানি করতে পেরেছেন। এই গতিতে চললে এবং বছরে ৩৬৫ দিনই কাজ করলেও তার এক্তিয়ারে থাকা বাকি ৫ লাখ মামলার নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১৪৫ বছর সময় লেগে যাবে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি এ পর্যন্ত মাত্র ৪২৫টি আপিলের নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন। এখনো তার এখতিয়ারে বিচারাধীন আপিল রয়েছে প্রায় প্রায় ৫.৩ লাখ। ফলে একজন ট্রাইব্যুনাল বিচারপতির ওপর যে বিপুল সংখ্যক আপিলের আবেদনের বোঝা চেপেছে, তা থেকেই সমস্যার ব্যাপকতা বোঝা যায়।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ পড়ার বিষয়ে দায়ের করা আপিলগুলোর শুনানির জন্য ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে যে, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে প্রাথমিকভাবে ৩৮ লক্ষেরও বেশি আপিল দায়ের করা হয়েছিল। হলফনামা অনুযায়ী, ৩৭ লক্ষেরও বেশি আপিল এখনও বিচারাধীন রয়েছে এবং মাত্র ১ লক্ষ ২ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটাররাই ২২ লক্ষেরও বেশি আপিল দায়ের করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গত ১৩ এপ্রিল এসআইআর আপিল ট্রাইব্যুনালগুলির কাজকর্ম শুরু হয়েছে। হাইকোর্টের ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে এতে নিয়োগ করা হয়েছে।
সেই ১৯টি ট্রাইব্যুনালের একটির দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রপ্ত বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় পদত্যাগের কারণ হিসেবে তার সল্টলেকের বাসভবন থেকে খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে ২৭ কিলোমিটার দূরে জোকার শুনানি কেন্দ্রে যাতায়াতের দীর্ঘ ও কষ্টকর পথের কথা উল্লেখ করেছেন।
আগামী নভেম্বরে হাওড়া ও কলকাতায় পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ করা সংগঠন ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’-এর আহ্বায়ক কুশল দেবনাথ বলেছেন, “ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সুপ্রিম কোর্টকে শুনানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কমিশন বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে।”
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই এই ট্রাইব্যুনালগুলি গঠন করা হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেল আপিল ট্রাইব্যুনালগুলোর কাজকর্ম সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।”
বিচারপতি চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি যেসব আপিলের নিষ্পত্তি করেছেন, তার মধ্যে ৮২.৩৫ শতাংশ আবেদনকারীই প্রকৃত ভোটার ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, আমি এ পর্যন্ত ৪২৫টি আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে ৩৫০ জন আবেদনকারীর নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করা হয়েছে এবং ৭৫ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
মুসলিম-প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদে "যৌক্তিক অসঙ্গতি"-র কারণে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই জেলায় বিধানসভা আসন রয়েছে ২২টি। বিচারপতি চট্টোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদের জন্য নিযুক্ত দুজন ট্রাইব্যুনাল বিচারপতির মধ্যে একজন। তিনি ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের আপিল সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। কলকাতা হাইকোর্টের আরেকজন প্রাক্তন বিচারপতি বাকি ১১টি আসনের আপিলগুলো দেখেন। বিচারপতি চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ শুনানিই সংশ্লিষ্ট ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তার (বিডিও) কার্যালয়ের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে হচ্ছে। জানা গিয়েছে, কলকাতা সংলগ্ন একটি জেলার আপিল সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির দায়িত্বে থাকা আরেকজন বিচারপতিও দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে পদত্যাগের কথা বিবেচনা করছেন। গত মে মাসে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি.এস. শিবজ্ঞানম। এরপর জুলাই মাসে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন বিচারপতি রঞ্জিত বাগও।
