উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়কালে, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ এক একটি ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে, সমষ্টিগতভাবে, পৃথিবীর প্রায় ৮০ ভাগ ভূমি ও প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
পরিশেষে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বিভিন্ন উপনিবেশিত অঞ্চলে যুগপৎ জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে। তাছাড়া, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের ভেতর বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের প্রতিযোগিতামূলক লড়াইকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে, একদিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যদিকে উপনিবেশিত দেশসমূহে কোথাও শুধু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, আবার কোথাওবা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন- সমর্থিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিরোধের মুখে, বিভিন্ন মহাদেশে ইউরোপের ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে, উপনিবেশিত দেশগুলো একে একে স্বাধীন হতে থাকে এবং বিংশ শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর প্রায় সকল উপনিবেশিত দেশ ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে।
সাধারণভাবে, এই হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের ৫০০ বছরের উত্থান-পতনের কালপঞ্জি।
কিন্তু আমরা যদি ১৪১৫ সালের আগস্ট মাসে পর্তুগাল কর্তৃক উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর উপনিবেশায়নকে পৃথিবীতে ইউরোপীয় উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করি, আর সেই পর্তুগাল কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ইতিপূর্বে উপনিবেশিত এশিয়ার ম্যাকাও দ্বীপকে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সময়কালকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক দখলদারত্বের অবসান হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা অঞ্চল নানা মেয়াদে প্রায় ৬০০ বছর ধরে স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ব্রিটেনসহ নানা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির শাসন-শোষণাধীন থেকেছে। অন্য কথায়, এই সব অঞ্চলের কয়েক শ’ কোটি মানুষ প্রায় ৬০০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়কালব্যাপী ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের নিগড়ে শৃঙ্খলিত থেকেছে।
স্পেন তার ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব শুরু করে ১৪৯৩ সালে, দক্ষিণ আমেরিকার দ্বীপ হিসপানিওয়ালার - যা বর্তমানে হাইতি রিপাবলিক ও ডমিনিকান রিপাবলিক নামে দু’টি স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিত- উপনিবেশায়নের মাধ্যমে, আর তার ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৮৯৮ সালে, দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাহ্ণে উপনিবেশিত দেশ কিউবার স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে। ওদিকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব শুরু হয় ১৬০৭ সালে, উত্তর আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, আর তার ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে ১৯৯৯ সালে, চীনের কাছে ইতিপূর্বে উপনিবেশিত হংকং দ্বীপ হস্তান্তরের মাধ্যমে। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডস তার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া শুরু করে ১৬১৯ সালে, ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শহরের ওপর দখলদারত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, আর এই ডাচ্ বা ওলন্দাজদের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে ১৯৭৫ সালে, দক্ষিণ আমেরিকার ইতিপূর্বে উপনিবেশিত দেশ সুরিনামের স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে।
উপনিবেশায়ন ও ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি কোনো সরলরৈখিক পথে অগ্রসর হয়নি। পৃথিবীর প্রায় কোথাও কোনো ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক সহজেই যেমন কোনো উপনিবেশ নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি, প্রায় সর্বত্রই যেমন নানা স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতিরোধ মোকাবেলা করেই তাকে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে, তেমনি কোনো অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের পরও, কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের সুবিধাবাদী একাংশের সহযোগিতা সত্ত্বেও, ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো বরাবরই নানা ধরনের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে। আবার, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ কখনোই দয়াপরবশ হয়ে উপনিবেশগুলো পরিত্যাগ করেনি, একদিকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা, আর অন্যদিকে উপনিবেশগুলোতে বিকশিত স্বাধীনতাপন্থি লড়াকু সংগ্রামের তীব্রতার মুখেই কেবল তারা উপনিবেশগুলো থেকে বিদায় গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ সর্বত্রই তারা বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছে। ইতিমধ্যে, উপনিবেশ নির্মাণ ও পরিত্যাগের মধ্যবর্তী কয়েক শ’ বছর ধরে, উপনিবেশিত অঞ্চলসমূহে বহু রক্তাক্ত সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে- স্বাধীনতাকামী অসংখ্য নর-নারী ও শিশুর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে উপনিবেশবাদী অধীনতা থেকে মুক্তির সংগ্রামী ইতিহাস।
কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ‘স্বাধীনতা’ অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই, ইতিপূর্বে উপনিবেশিত কোনো জনগোষ্ঠীর মন ও মনন স্বাধীন হয়ে যায় না- ঔপনিবেশিক শাসনাধীন চিন্তাপদ্ধতির অভ্যাস টিকে থাকে, যার বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবল যথার্থ স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হওয়া যায়।
দুই
দেশে দেশে উপনিবেশবাদ ঠিক কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্রতিষ্ঠার পর তা দীর্ঘকাল জারি রাখার জন্য কী প্রক্রিয়ায় উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কী কী ধরনের বিকৃতি সাধন করেছে, সেসব বিকৃতি আবার সংশ্লিষ্ট জনমানসের ওপর কি কি ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, আর কীভাবেই-বা তার প্রভাব উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান থাকে, গণতান্ত্রিক মুক্তিকামী যেকোনো উপনিবেশোত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য তা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা অপরিহার্য- যথার্থ মুক্তি লাভের জন্যই তা জরুরি।
একজন ব্রিটিশ ‘জাতীয়তাবাদী’ ইতিহাসবিদ, নিয়াল ক্যাম্পবেল ফার্গুসন (জন্ম: ১৯৬৪), প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ অধ্যুষিত বিশাল ভারতবর্ষকে মাত্র ৯০০ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭০,০০০ ব্রিটিশ সৈন্য কীভাবে এত দীর্ঘকাল ধরে শাসন-নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়েছিল?৪ নিজের উত্থাপিত এই প্রশ্নের জবাবে, ফার্গুসন নিজেই দাবি করেছেন, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের উদ্ভাবিত ‘টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনযুক্ত জাহাজের নৌপথ’ লন্ডনের সঙ্গে তার অধিকৃত অঞ্চলসমূহের দূরত্ব কমিয়ে দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা সহজতর করে দিয়েছিল’। কেননা, একদা লন্ডন থেকে কোনো উপনিবেশিত অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রশাসনকে কোনো দিকনির্দেশনামূলক জরুরি বার্তা পৌঁছাতে যেখানে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত, টেলিগ্রাফ আবিষ্কারের পর তা ‘মাত্র একদিনের মধ্যেই’ সম্ভব হয়ে যায়। তাছাড়া, ব্রিটিশ রেল-যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতে তার ‘অর্থনৈতিক স্বার্থেরই শুধু বিকাশ ঘটায়নি’, নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে ‘কৌশলগত সামরিক সুবিধাও’ প্রদান করেছে।৫
এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীতে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্য সংখ্যা মোটেও ‘দীর্ঘকাল ধরে’ স্থির ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, ১৯১৪ সালে, ব্রিটিশ-ভারতীয় স্থায়ী সেনাবাহিনীতে ৩,০০০ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ৭৫,০০০ ব্রিটিশ সৈন্যসহ মোট প্রায় ২,৮২,০০০ জন সামরিক ব্যক্তি কর্মরত ছিল এবং এই যুদ্ধ প্রক্রিয়ায়, শেষ পর্যন্ত, ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা প্রায় ১৪,৫০,০০০-তে পৌঁছেছিল। প্রধানত ভারতের দরিদ্র কৃষকের এবং সন্তানদেরই ব্রিটিশ-ভারতীয় বাহিনীতে সৈন্য হিসেবে খুবই নিম্ন বেতনে নিয়োগ করা হতো। আপন দেশের বিদ্রোহী দেশপ্রেমিক মানুষদের অবদমন, নিপীড়ন, এমনকি হত্যা করার মতো যাবতীয় ঔপনিবেশিক স্বার্থ-প্রণোদিত অসভ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই দরিদ্র ভারতীয়দের ব্যবহার করা হতো।
উদাহরণ হিসেবে, ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশভুক্ত অমৃতসরের জালিনওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিল্যান্ড ডায়ারের নেতৃত্বে সংঘটিত কুখ্যাত গণহত্যার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
১৯১৮ সালের নভেম্বরে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায়, ১৯১৯ সালের মার্চে, দিল্লিস্থ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল, ভারতীয় সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে, অ্যানর্কিকেল অ্যান্ড রেভ্যুলুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট নামে একটি চরম নিপীড়নমূলক আইন পাস করে। এই আইনের অধীনে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার ‘অভিযোগে’ যেকোনো ‘সন্দেহভাজন’ ভারতীয়কে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা, বিনা বিচারে আটক রাখা, আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই গোপনে বিচার করা, ইত্যাদির বিধান প্রণয়ন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থনে অসংখ্য ভারতীয় সৈন্যের আত্মত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে, ভারতীয়দের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারণের পরিবর্তে, এই নিপীড়নমূলক আইন প্রণয়নকে ভারতের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল ও জনগোষ্ঠীকে শুধু বিস্মিতই করেনি, বিক্ষুব্ধও করেছিল। ফলে, এই আইনের বিরুদ্ধে মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে ভারতবর্ষ জুড়ে প্রতিবাদ সভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এমতাবস্থায়, ৯ই এপ্রিল, ব্রিটিশ সরকার পাঞ্জাব প্রদেশের দুজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতাকে- ডাক্তার সত্যপাল সিং (১৮৮৫-১৯৫৪) ও ব্যারিস্টার সফিউদ্দিন কিচলু (১৮৮৮-১৯৬৩) -গ্রেপ্তার করে। এই নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এমতাবস্থায়, ১৩ই এপ্রিল, পাঞ্জাবের অমৃতস্বরের জালিনওয়ালাবাগের একটি দেয়ালঘেরা প্রান্তরে ঐতিহ্যশালী ‘বৈশাখী উৎসব’ পালনের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ সমবেত হয়। কিন্তু এই জমায়েতকে প্রতিবাদী রাজনৈতিক সমাবেশ সন্দেহে, ব্রিটিশ প্রশাসনের নির্দেশে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ একদল সৈন্য নিয়ে, যাদের মধ্যে অধিকাংশ ছিল ভারতীয়, জালিনওয়ালাবাগে উপস্থিত হন এবং বাগানটির সকল নির্গমন পথ বন্ধ করে দিয়ে, নির্বিচারে সরাসরি গুলিবর্ষণের আদেশ দেন। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ বাগানের মাত্র দেড়শ’ গজ দূর থেকে, দশ মিনিট ধরে অবিরাম গুলিবর্ষণের ফলে, সরকারি হিসেবেই, ৩৭৯ জন নারী-পুরুষ ও শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারায় এবং এক হাজারেরও বেশি আহত হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঘটনাটি জালিনওয়ালাবাগ গণহত্যা হিসেবে কুখ্যাত হয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
৪. প্রাগুক্ত, p. 163
৫. প্রাগুক্ত, p. 169, 170
