Colonialism has led to racism, racial discrimination, xenophobia and related intolerance [...] Africans and people of African descent, and people of Asian descent and indigenous peoples were victims of colonialism and continue to be victims of its consequences.
-Durban Declaration of the World Conference against Racism, Racial Discrimination, Xenophobia and Related Intolerance, 2001
ঔপনিবেশিক রাজনীতি নিয়ে আলাপ করার ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে, ‘উপনিবেশবাদ’ বলতে কী বোঝায়, প্রথমেই তা নিয়ে আলাপ করা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের সাধারণ পরিচয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বিস্তার ও শাসন-শোষণের নির্দিষ্ট সময়কাল সম্পর্কে ধারণাও আমাদের এই আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন অধিকৃত অঞ্চলে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য উপনিবেশবাদ কী কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, বিশেষত উপনিবেশিত অঞ্চলের ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে উপনিবেশবাদ কীভাবে কাজ করে গেছে, সেই আলোচনাটি তার পর্যালোচনা জরুরি। পরিশেষে আমরা আলোচনা করব, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ অবসানের পরও ‘স্বাধীন’ দেশগুলোতে কীভাবে নানা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রের জনস্বার্থপরায়ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে অন্তরায় হিসেবে জারি থাকে এবং সেই অন্তরায়গুলো অতিক্রম করার জন্য কীভাবে ঔপনিবেশিক অবশেষগুলোর বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করা সম্ভব।
উপনিবেশবাদ শব্দটি, রাজনীতি-সচেতন পাঠকমাত্রই অবগত, ইংরেজি ‘colonialism’ শব্দের বাংলা অনুবাদ। কিন্তু ইংরেজি ‘colonialism’ শব্দটি আবার এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। চিরায়ত ল্যাটিন ভাষায় ‘colonialism’-এর প্রতিশব্দ না থাকলেও, ভাষার বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ল্যাটিন ‘পড়ষবৎব’ আর ‘পড়ষড়হরধ’ শব্দযুগল মিলে ইংরেজিতে ‘পড়ষড়হরধষরংস’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। ল্যাটিন ‘পড়ষবৎব’ শব্দের অর্থ হলো ‘চাষ করা’ বা ‘বসবাস করা’, আর ‘পড়ষড়হরধ’ মানে হলো চাষের ভূমি, বা ভূসম্পত্তি বা আবাসন। রোম সাম্রাজের আমলে, প্রথম থেকে পঞ্চম শতাব্দীতে, রোমান রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে নিজেদের অনেক নাগরিককে নিজেদের অধিকৃত কোনো দূরবর্তী অঞ্চলে ভূমি আবাদ করে বসবাস করার জন্য পাঠিয়ে দিতো এবং সেই দূরবর্তী অঞ্চলে আবাস গড়ে তুলে, স্থানীয় অর্থকরী ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে, নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করার পাশাপাশি, তারা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতো।
অষ্টাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এই প্রপঞ্চটি ইংরেজি ভাষায় ‘colonialism’ নামে প্রবেশ করে, আর তার অর্থ দাঁড়ায়- ‘এমন একটি পদক্ষেপ বা প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো একটি দেশ অন্য কোনো দেশের কোনো অঞ্চলে নিজের নাগরিকদের কখনো ফুঁসলিয়ে-ফাঁসলিয়ে, কখনো বা বলপূর্বক, পাঠিয়ে দেয়া হয়, যাতে তারা সেখানে বসতি গেড়ে সেই দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা বা শাসন করতে পারে।’ সেক্ষেত্রে, যে শক্তিমান দেশটি অন্য দেশে নিজের নাগরিক পাঠিয়ে শেষোক্তের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, সে দেশটিকে ‘ঔপনিবেশিক শক্তি’; আর যে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয় তাকে ‘উপনিবেশিত’ দেশ বা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। আধুনিক জমানায়, এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটিই ‘উপনিবেশবাদ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। ফলে, উপনিবেশবাদ বলতে, সাধারণভাবে, এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে কোনো বিদেশি শক্তি অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চল ও তার জনসাধারণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর, নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নিজের সর্বাঙ্গীণ আধিপত্য পাকাপোক্ত করার জন্য স্থানীয় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় রূপান্তর সাধন করে। স্বভাবতই, প্যালেস্টাইনি বংশোদ্ভূত খ্যাতিমান মার্কিন বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) ‘উপনিবেশবাদ’কে দেখেছেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যবাদের [কু]ফল হিসেবে সৃষ্ট একটি প্রক্রিয়া হিসেবে, যার অধীনে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার অধিকৃত দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে আপন স্বার্থে বসতি স্থাপন করে।’১
এখন আবার প্রশ্ন দাঁড়ায়, ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কী?
পৃথিবীর নানা রাজনীতিক, পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী ‘সাম্রাজ্যবাদ’কে নানাভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান নেতা ও বুদ্ধিজীবী ভøাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৫) ১৯১৭ সালে, অর্থশাস্ত্রের আলোকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’কে ব্যাখ্যা করেছেন ‘পুঁজিতন্ত্রের সর্বোচ্চ বিকশিত রূপ’ হিসেবে, ‘উপনিবেশবাদ’ যার ‘একটি সহজাত উপাদান’। অন্যদিকে, এডওয়ার্ড সাঈদ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্ক-বিষয়ক নিজের একটি গ্রন্থের শুরুতেই সাম্রাজ্যবাদ বা ‘সাম্রাজ্যের’ সংজ্ঞার জন্য আন্তর্জাতিক-সম্পর্কের মার্কিনি পণ্ডিত মিশেল ডয়েলের (জন্ম: ১৯৪৮) ধারণাকে ব্যবহার করেছেন। ডয়েল মনে করেন, “সাম্রাজ্য হলো এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক, যা একটি রাষ্ট্র অন্য একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক সমাজকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বল প্রয়োগ, [স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশের সঙ্গে] রাজনৈতিক আঁতাত, কিংবা অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নির্ভরতা ব্যবহার করে এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদ হলো এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও জারি রাখার প্রক্রিয়া।”২ এক্ষেত্রে, মনে রাখা জরুরি যে, যুগপৎ বর্ণবাদ ও পুরুষতন্ত্র হলো উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্নিহিত দু’টি অনিবার্য অনুষঙ্গ।
যা-ই হোক, কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির পক্ষে অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলের দখল নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা কখনোই খুব সহজ ব্যাপার ছিল না, বরং নানা ছল ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে অপরাপর অঞ্চল ও দেশের ওপর নিজেদের প্রাথমিক দখলদারত্ব কায়েম করতে হয়েছে। তাছাড়া, কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের কোনো দেশকে প্রাথমিকভাবে দখলে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়নি, অধিকৃত অঞ্চলগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দীর্ঘস্থায়ী উপনিবেশে পরিণত হয়নি, তার জন্য বরং ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়ন ও প্রয়োগের প্রয়োজন হয়েছে। আর, এভাবে অধিকৃত ভূখণ্ডে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের প্রযুক্ত সেই সব কৌশলকেই আমরা ‘ঔপনিবেশিক রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করি। প্রাথমিকভাবে অধিকৃত অঞ্চলসমূহের উপনিবেশয়ানের জন্য, বলপ্রয়োগ ছাড়াও, যেসব পরিসরে ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহকে নানা ব্যবস্থা ও কৌশল গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে হয়েছে, তাদের মধ্যে ইতিহাস চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার পরিসর ছিল অন্যতম।
পৃথিবীর নানা অঞ্চলে নিজেদের শাসন-শোষণকে প্রলম্বিত করার জন্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ প্রথমোক্তদের ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষা সম্পর্কে যেসব কৌশলগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বা, অন্য কথায়, এসব জনগুরুত্বপূর্ণ পরিসরে যেসব গণবিরোধী রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে, সমসাময়িক কালের জনমনে তার ক্ষতিকর প্রভাব, উপনিবেশোত্তর সময়কালে সংশ্লিষ্ট সমাজ ও রাষ্ট্রসমূহের জনস্বার্থপরায়ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য সেই পুরনো প্রভাব কীভাবে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে হাজির রয়েছে, আর ওই সব নেতিবাচকতা কাটিয়ে উঠে বর্তমানে ‘স্বাধীন’ সমাজ ও রাষ্ট্রগুলো সৃষ্টিশীল পথে অগ্রসর হতে পারে, ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনাই বর্তমান প্রবন্ধের উপজীব্য।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কোন সময় থেকে কত বছর পর্যন্ত উপনিবেশবাদ প্রত্যক্ষভাবে জারি ছিল এবং কোন কোন পশ্চিমা শক্তি এই উপনিবেশবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক তৎপরতায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে, আগেই বলেছি, তার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত, খুব সংক্ষেপে হলেও, পাঠকদের সামনে হাজির থাকা প্রয়োজন।
উপনিবেশবাদের আলোচনায়, সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর অবসান পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৫০০ বছর ধরে পৃথিবীর নানা অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব ও শোষণ-নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার অধীনস্থ থেকেছে। এই ৫০০ বছরের মধ্যে, সাধারণভাবে, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দী ছিল সমুদ্রপথে বাণিজ্য বিস্তার প্রক্রিয়ায় প্রধানত পর্তুগাল ও স্পেনের তরফে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে, বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায়, আপন আপন আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য উপনিবেশায়ন শুরুর কাল। তারপর, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও ব্রিটেন পৃথিবীর নানা অঞ্চলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি মালিকানাধীন কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর মাধ্যমেÑ যেমন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০০-১৮৭৪), ডাচ্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০২-১৭৯৯), ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬১৬-১৬৫০) ও (১৬৭০-১৭২৯), পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬২৮-১৬৩৩), ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬৬৪-১৭৬৯), প্রভৃতিÑ আপন আপন দেশের বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জগৎজোড়া উপনিবেশায়ন প্রকল্পে নতুন নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রধানত, ‘ব্রিটিশ বাণিজ্য ও ভোক্তা অর্থনীতির বিকাশের প্রয়োজনে, বিশেষত তার ক্রমবর্ধমান চিনির চাহিদা মেটাতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে, আর মসলা, চা ও বস্ত্রের জন্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে’ প্রবেশ করার মাধ্যমে, ব্রিটিশ ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রণোদনা সৃষ্টি হয়।৩ তারপর, ঊনবিংশ শতাব্দীতে, নানা অঞ্চলে নিপীড়নমূলক ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের মাধ্যমে অর্জিত ধন-সম্পদ, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও পুঁজিতান্ত্রিক শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে বলীয়ান ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসমূহ দুনিয়াজোড়া পণ্যের কাঁচামাল ও বাজারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের রূপ পরিগ্রহ করে এবং ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো, বিশেষত ব্রিটেন, আফ্রিকা ও এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্যমূলক ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিস্তার ও স্থায়িত্বের জন্য পুরোপুরি রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
তথ্যসূত্র:
১. Edward W. Said, Culture and imperialism, p. 8
২. Michael W. Doyle, Empires, p. 45
৩. Niall Ferguson, Empire: How Britain made the modern world, p. XXV
