আমি ডাক্তার কদম আলী, আমার কোনো ডিগ্রি নাই

আমি ডাক্তার কদম আলী, আমার কোনো ডিগ্রি নাই

ফন্ট সাইজ:

“আমি ডাক্তার কদম আলী, আমার কোনো ডিগ্রি নাই”-বাক্যটি ব্যঙ্গাত্মক। কিন্তু এর মধ্যে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে জেলা শহর, এমনকি রাজধানী পর্যন্ত অনেক মানুষ চিকিৎসকের প্রকৃত পরিচয়, ডিগ্রি, নিবন্ধন ও বিশেষজ্ঞতার সত্যতা যাচাই না করেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। কোথাও ওষুধ বিক্রেতা চিকিৎসকের ভূমিকা নিচ্ছেন, কোথাও পল্লিচিকিৎসক জটিল রোগের চিকিৎসা করছেন, কোথাও ভুয়া ডিগ্রিধারী ব্যক্তি চেম্বার খুলে বসছেন, আবার কোথাও প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তি নিজেকে বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে রুগীর জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতাল গুলোতে রুগীর চাপ, শয্যা সংকট, জনবল ঘাটতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা না বুঝেই রোগীর মৃত্যু বা জটিলতার প্রতিটি ঘটনায় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিচারে, ভিডিও ধারণ করে অপমানের সংস্কৃতিতে এবং কিছু স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উসকানিতে হাসপাতাল ক্রমেই নিরাপদ চিকিৎসা কেন্দ্রের বদলে আতঙ্কের স্থানে পরিণত হচ্ছে।
এ অবস্থার অবসান না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন রোগী, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মী এবং সর্বোপরি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।
চিকিৎসক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে
একজন চিকিৎসকের পরিচয়ের ভিত্তি হলো স্বীকৃত চিকিৎসাশিক্ষা, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুমোদিত প্রশিক্ষণ। এমবিবিএস বা সমমানের স্বীকৃত ডিগ্রি, বৈধ নিবন্ধন এবং বিশেষজ্ঞতার প্রমাণ ছাড়া কাউকে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন লেখা বা চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় না।
কিন্তু বাস্তবে এই মৌলিক সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। দেশের অনেক স্থানে রোগী প্রথমে যান ফার্মেসিতে। সেখানে উপসর্গ শুনে ওষুধ দেওয়া হয়, অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, ইনজেকশন দেওয়া হয়, কখনো কখনো জটিল রোগের চিকিৎসাও শুরু হয়। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন রুগীর স্বজনের প্রশ্নÑ“হাসপাতালে আনার পর রোগীর অবস্থা খারাপ হলো কেন?” অথচ রোগটি কত দিন ধরে চলছিল, আগে কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ব্যবহার হয়েছে, রোগী কত দেরিতে হাসপাতালে এসেছেনÑএসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে থেকে যায়।
ভুয়া চিকিৎসা শুধু ভুয়া ডিগ্রিধারীর বিষয় নয়। ভুয়া চিকিৎসা হলোÑ
* নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসক পরিচয় ব্যবহার করা;
* স্বীকৃত যোগ্যতা ছাড়া বিশেষজ্ঞ পরিচয় দেওয়া;
* ওষুধ বিক্রির জায়গাকে চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত করা;
* প্রেসক্রিপশন ছাড়া শক্তিশালী ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া;
* রোগীর অবস্থা ও ঝুঁকি না বুঝে ইনজেকশন, স্যালাইন বা অন্য চিকিৎসা শুরু করা;
* অনুমোদন, দক্ষ জনবল ও জরুরি ব্যবস্থাপনা ছাড়া ক্লিনিক বা হাসপাতাল পরিচালনা করা;
* ভুয়া পরীক্ষা, ভুল রিপোর্ট বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর অর্থ ও জীবন ঝুঁকিতে ফেলা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলোÑকে প্রকৃত চিকিৎসক, কে নিবন্ধিত চিকিৎসক, কে বিশেষজ্ঞ এবং কে অবৈধভাবে চিকিৎসা করছেনÑএ তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা।
প্রতিটি চেম্বার, প্রেসক্রিপশন প্যাড, হাসপাতালের ওয়েবসাইট ও সাইনবোর্ডে চিকিৎসকের পূর্ণ নাম, ডিগ্রি ও নিবন্ধন নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে। রোগী যেন মোবাইল ফোনেই নিবন্ধন যাচাই করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী ও অবৈধ চিকিৎসাদাতাদের বিরুদ্ধে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, ধারাবাহিক জেলা-উপজেলাভিত্তিক অভিযান এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
হাসপাতালকে মবের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে না
চিকিৎসা সেবা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত রোগীর জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সিসিইউ, নবজাতক ইউনিট কিংবা প্রসূতি বিভাগে উত্তেজিত জনতার প্রবেশ বা হামলা শুধু চিকিৎসককে নয়, একই সময়ে চিকিৎসাধীন বহু রোগীকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
কিন্তু দেশে এখন একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো রোগী মারা গেলেই বা চিকিৎসায় জটিলতা দেখা দিলেই, প্রকৃত কারণ যাচাইয়ের আগেই হাসপাতাল ঘেরাও করা হয়; চিকিৎসক ও নার্সদের গালিগালাজ করা হয়; মোবাইল ফোনে ভিডিও করে অপমান করা হয়; কখনো মারধর, ভাঙচুর ও চিকিৎসা সেবা বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্বার্থান্বেষী চক্র, দালাল, অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী অথবা তথাকথিত অনলাইন সাংবাদিক এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেন।
মব কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোনো মেডিকেল বোর্ড নয়। উত্তেজিত জনতা কোনো ক্লিনিক্যাল অডিট কমিটি নয়।
কোনো রোগীর মৃত্যু বা ক্ষতি চিকিৎসার ভুলে, গাফিলতিতে, রোগের জটিলতায়, দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে, নাকি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে হয়েছেÑতা নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা কমিটি। এই প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও রোগীবান্ধব হতে হবে। কিন্তু বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে; মবের ভিত্তিতে নয়।
চিকিৎসককে ভয় দেখিয়ে, অপমান করে বা হাসপাতালে হামলা চালিয়ে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। বরং চিকিৎসকেরা ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে গ্রহণ করতে ভয় পান, জরুরি সিদ্ধান্তে বিলম্ব হয়, রেফারেল বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
শয্যা কম, রোুগী বেশিÑএ বাস্তবতা মব জানে না
বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বড় সংকট হলোÑশয্যার তুলনায় বহুগুণ রোগীর চাপ। দেশের পুরোনো ও বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গুলোতে অনুমোদিত শয্যার দুই থেকে তিন গুণ, কোথাও তারও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। অনেক রোগীকে করিডোরে, বারান্দায়, ওয়ার্ডের মেঝেতে, লিফটের সামনে বা সিঁড়ির কাছাকাছি জায়গায় চিকিৎসা নিতে হয়।
এটি কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা।
একজন চিকিৎসক যখন নির্ধারিত সংখ্যার কয়েক গুণ রোগী দেখেন, একজন নার্স যখন বিপুলসংখ্যক রোগীর ওষুধ, ইনজেকশন, পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সেবা সামলান, একজন টেকনোলজিস্ট যখন সীমিত যন্ত্রপাতি নিয়ে শত শত পরীক্ষা সম্পন্ন করেন, তখন ভুলের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু এই ঝুঁকির দায় শুধু মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
রোগী যদি শয্যা না পান, তার কারণ চিকিৎসক নন।
রোগী যদি মেঝেতে চিকিৎসা নেন, তার কারণ চিকিৎসক নন।
আইসিইউ শয্যা না থাকলে, অক্সিজেন সংকট হলে, রিএজেন্ট না থাকলে, মেশিন নষ্ট থাকলে বা পর্যাপ্ত নার্স না থাকলেÑতার দায় শুধু দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের ওপর দেওয়া অন্যায়।
এই বাস্তবতা বুঝতে হবে।
দেশে প্রায় দেড় লাখ নিবন্ধিত এমবিবিএস ও বিডিএস চিকিৎসক থাকলেও তাঁদের সবাই সরকারি হাসপাতালে কর্মরত নন, সবাই একই অঞ্চলে কাজ করেন না এবং সবাই একই ধরনের সেবা দেন না। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলজিস্ট ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও জনসংখ্যা, রোগীর চাপ এবং হাসপাতালের বিস্তারের তুলনায় তা এখনো অপর্যাপ্ত। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলোÑজনবলের অসম বণ্টন। রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ নার্স, অ্যানেসথেটিস্ট, টেকনোলজিস্ট এবং জরুরি সেবার ঘাটতি প্রকট।
হাসপাতালের সংকট শুধু চিকিৎসকের নয়
একটি হাসপাতালকে কার্যকরভাবে চালাতে শুধু চিকিৎসক যথেষ্ট নন। প্রয়োজনÑ
* পর্যাপ্ত শয্যা;
* চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক;
* নার্স ও মিডওয়াইফ;
* মেডিকেল টেকনোলজিস্ট;
* ফার্মাসিস্ট;
* পরিচ্ছন্নতাকর্মী;
* ওয়ার্ড বয় ও সাপোর্ট স্টাফ;
* নিরাপত্তাকর্মী;
* অ্যাম্বুলেন্স ও রেফারেল ব্যবস্থা;
* রক্তব্যাংক ও জরুরি ল্যাবরেটরি;
* অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, মনিটর ও জরুরি ওষুধ;
* সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও পরীক্ষাগারের নিরবচ্ছিন্ন সেবা;
* সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা;
* রোগীর অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের ব্যবস্থা।
এসবের যেকোনো একটি দুর্বল হলে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় অনেক সরকারি হাসপাতালে একই সঙ্গে শয্যা সংকট, জনবল ঘাটতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, যন্ত্রপাতি বিকল থাকা, ওষুধ ও রিএজেন্ট সংকট, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি এবং নিরাপত্তাহীনতা থাকে।
একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তি হলো, কিন্তু শয্যা নেই। তাকে মেঝেতে রাখতে হলো। রোগীর পরীক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু যন্ত্র নষ্ট বা রিএজেন্ট নেই। বাইরে পরীক্ষা করতে হলো। আইসিইউ প্রয়োজন, কিন্তু শয্যা খালি নেই। চিকিৎসক রুগীকে উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠালেন। এরপর রুগীর স্বজনের মনে ধারণা তৈরি হলোÑ“ডাক্তার চিকিৎসা দিলেন না।” অথচ বাস্তবতা হলো, চিকিৎসক সীমিত ব্যবস্থার মধ্যে রোগীর জন্য সর্বোত্তম পথ খুঁজেছেন।
সরকারি হাসপাতালকে শক্তিশালী না করে চিকিৎসকের বিচার নয়
দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারি হাসপাতাল শক্তিশালী না হলে মানুষের ভরসা অনিবন্ধিত ও অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসাদাতাদের ওপরই থাকবে। জেলা হাসপাতাল গুলোতে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিয়া সেবা, জরুরি অস্ত্রোপচার, রক্তব্যাংক, আইসিইউ-এইচডিইউ, নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা ও নিরাপদ রেফারেল ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি সেবা, মৌলিক পরীক্ষা, প্রসূতি সেবা, শিশু সেবা, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত রেফারেলের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা পর্যায়ে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী দ্রুত উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক থাকতে হবে।রাজধানীর কয়েকটি বড় হাসপাতালকে দেশের সব রোগীর শেষ আশ্রয় বানিয়ে রাখলে শয্যা ও জনবলের ওপর চাপ বাড়তেই থাকবে। ফলে একজন রোগী চিকিৎসা পাওয়ার আগে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবেন, আর একজন চিকিৎসক রোগী দেখার আগে অমানবিক চাপের মুখে পড়বেন।
ভুয়া চিকিৎসা বন্ধ ও মব প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়
স্বাস্থ্যখাতকে শৃঙ্খলায় আনতে অবিলম্বে কয়েকটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, প্রকৃত চিকিৎসক শনাক্তে একটি জাতীয় ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি করতে হবে। রোগী মোবাইল নম্বর বা কিউআর কোড স্ক্যান করেই চিকিৎসকের নিবন্ধন, ডিগ্রি ও বিশেষজ্ঞতার তথ্য যাচাই করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, ভুয়া চিকিৎসক, ভুয়া বিশেষজ্ঞ, অবৈধ চেম্বার ও অননুমোদিত ক্লিনিকের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। এই অভিযান যেন শুধু ছবি তোলা বা সাময়িক ভ্রাম্যমাণ আদালতে সীমাবদ্ধ না থাকে; পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল, জরিমানা ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, ওষুধের দোকানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশন ও ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। ফার্মেসিগুলোকে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ও ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, জরুরি সেবা, অক্সিজেন, রক্তব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগী-নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতিটি হাসপাতালের জন্য রোগী অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে। গুরুতর অভিযোগ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ বোর্ডের প্রতিবেদন দিতে হবে।
ষষ্ঠত, হাসপাতালকে ‘মবমুক্ত নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করতে হবে। জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, আইসিইউ, সিসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা হলে দ্রুত মামলা, তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সপ্তমত, সরকারি হাসপাতালের শয্যা, জনবল, যন্ত্রপাতি, ওষুধ, রিএজেন্ট, আইসিইউ ও জরুরি সেবার তথ্য নিয়মিত জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। মানুষ জানতে চানÑকত শয্যার হাসপাতালে কত রোগী ভর্তি, কত চিকিৎসক ও নার্স আছেন, কোন পরীক্ষা চালু আছে, কোন যন্ত্র নষ্ট, কত দিন ধরে নষ্ট এবং কবে তা মেরামত হবে। এই স্বচ্ছতা জবাবদিহি বাড়াবে, গুজব কমাবে এবং মব তৈরির সুযোগ সংকুচিত করবে।
চিকিৎসা পেশার মর্যাদা ফিরুক
চিকিৎসককে সম্মান দেওয়া মানে ভুলকে আড়াল করা নয়। রোগীর অধিকার নিশ্চিত করা মানে চিকিৎসককে অপমান করা নয়। ভুয়া চিকিৎসা বন্ধ করা মানে প্রকৃত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরি করা নয়। আর কোনো রোগীর মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত চাওয়া মানে হাসপাতাল ভাঙচুর করা নয়।
বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা সীমিত শয্যা, সীমিত জনবল, অপ্রতুল যন্ত্রপাতি এবং বিপুল রোগীর চাপের মধ্যেও নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সেই সেবাকে নিরাপদ রাখতে হবে। একই সঙ্গে পেশার ভেতরের অনৈতিকতা, অনিয়ম, কমিশন নির্ভরতা ও অসততা দূর করতে হবে।
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবেÑভুয়া চিকিৎসক ও হাসপাতাল কেন্দ্রিক মব একই মুদ্রার দুই পিঠ। একদিকে ভুয়া চিকিৎসা রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, অন্যদিকে মব প্রকৃত চিকিৎসা সেবাকে অচল করে দেয়। দুটোরই লাভবান হয় দালালচক্র, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা এবং অরাজকতা। আমরা একটি মানবিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই। যেখানে রোগী নিরাপদ থাকবেন, চিকিৎসক নিরাপদ থাকবেন এবং হাসপাতাল হবে সেবার স্থানÑভয়, অপমান ও মবের স্থান নয়।


লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।