রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করার লক্ষ্যে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ঢাকার ট্রাফিক জট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে এই বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সভায় তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প ও ইলেকট্রিক ট্রেনসহ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর প্রকল্প রয়েছে। এর ফলে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেনে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর। বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানান- পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ হিসাবে পাওয়া যাবে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে পাওয়া যাবে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত।
অনুমোদিত তিন মেট্রোরেল প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। এই তিন প্রকল্পের মধ্যে দু’টি প্রকল্প প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। মেট্রোরেলের তিনটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জাপানের অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় এবং নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে গঠিত এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্প।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত ব্যয়ের চিত্রে দেখা যায়, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে পরিচিত ৩১.২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯১৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে প্রায় ১১৭.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে এর সব কাজ সম্পন্ন করার চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সভায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যার প্রধান কাজ হলো- হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণ করা। এই প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত বিস্তৃত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটিও বেশ দ্রুত আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা জোগান দেয়া হবে। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা যৌথ ঋণ সহায়তা হিসেবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ইডিসিএফ। এই লাইনে ১৩.১০ কিলোমিটার থাকবে আন্ডারগ্রাউন্ড এবং বাকি অংশ হবে উড়াল পথ। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজার এবং তেজগাঁও হয়ে হাতিরঝিলের তলদেশ দিয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ টানেল মাটির ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণ করা হবে, যা নগরবাসীর যাতায়াতে যুক্ত করবে এক আধুনিক রূপকথা।
বৈঠক শেষে আগারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা ও এর চারপাশ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। তাই দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ না করলে সেপ্টেম্বর মাসের পরই জাইকা তাদের ঋণের সুদ হার পরিবর্তন করবে।’
মেট্রোরেলের পিলারে ফাটল ও বিয়ারিং প্যাডে ত্রুটির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এদিকে ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের ১৫টি প্রকল্প একনেক বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। এসব প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় পরিকল্পনামন্ত্রী নিজস্ব ক্ষমতাবলে এগুলো অনুমোদন করেছেন। পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত এসব প্রকল্প একনেক বৈঠকে অবহিত করতে হয়। পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন (২য় সংশোধিত), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ (১ম সংশোধিত), ভাসানচরে গ্রিন বেল্ট প্রতিষ্ঠা ও কক্সবাজারে রোহিঙ্গা প্রভাবিত এলাকায় পুনর্বনায়ন (১ম সংশোধিত), দেশি মুরগি গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জোরদারকরণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত) প্রকল্প। এ ছাড়া রংপুর জোনে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলী ও অন্যান্য সেতু প্রতিস্থাপন (১ম সংশোধিত), আরডিএ ভবনের ৫ম থেকে ১০ম তলা নির্মাণ, জালালাবাদ সেনানিবাসে এসআইঅ্যান্ডটির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কোয়ার্টার গার্ড নির্মাণ, সিলেট বিভাগে বন্যা পূর্বাভাসের জন্য থ্রিডি মডেল প্রস্তুতকরণ (১ম সংশোধিত), সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও খুলনা মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণ (এসএসপিআরআইটি) (১ম সংশোধিত) প্রকল্প, বরগুনা ও দিনাজপুর জেলা স্টেডিয়ামের উন্নয়ন এবং সিলেট-১০ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খনন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প সম্পর্কে একনেকে অবহিত করা হয়।
