চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) টানা সাড়ে পাঁচ মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ঠা মার্চ থেকে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয় ও লোকসানের চাপ। সিইউএফএল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩রা মার্চ সর্বশেষ উৎপাদনে ছিল কারখানাটি। পরদিন ৪ঠা মার্চ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন চালু রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন হয়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানাটি চালু করা সম্ভব হয়নি। সিইউএফএলের উপ-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরণ মারমা বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ঠা মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চলতি মাসে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। গ্যাস পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উৎপাদন চালু করা হবে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় সিইউএফএলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। উৎপাদন না হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে উৎপাদন থেকে কোনো আয় হচ্ছে না, অন্যদিকে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিইউএফএলের মতো বড় সার কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ইউরিয়ার চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলেই ধাপে ধাপে উৎপাদন চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর সরাসরি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে কারখানার বিভিন্ন ইউনিট, যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে গ্যাস প্রবাহ চালু করতে হবে। এরপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে নেয়া হবে। সিইউএফএল সূত্র আরও জানায়, প্রতিষ্ঠার সময় কারখানাটির দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন। বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন। দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও যন্ত্রপাতির সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কারখানাটিতে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টন এবং বছরে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ১৯৮৭ সালের ২৯শে অক্টোবর সিইউএফএল প্রতিষ্ঠিত হয়। জাপানের কারিগরি সহায়তায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কারখানাটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় চার দশক ধরে দেশের কৃষি খাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে চট্টগ্রামে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী রইস উদ্দিন আহমেদ বলেন, সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হয় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী। মন্ত্রণালয় থেকে কোন সময়ে কোন সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে এবং কোথায় সরবরাহ বন্ধ থাকবে সে বিষয়ে তালিকা দেয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুসারেই সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
