খাঁচা আছে প্রাণী নেই

খাঁচা আছে প্রাণী নেই

ফন্ট সাইজ:

বড় বড় খাঁচা আছে, আছে দর্শনার্থীদের হাঁটার পথ। চারপাশে সবুজের সমারোহ, রয়েছে পুকুর, বসার স্থান ও শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলাসহ নানা আয়োজন। কিন্তু চিড়িয়াখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রাণীই যখন অনুপস্থিত, তখন পুরো আয়োজনই যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় দীর্ঘদিন ধরে নেই বাঘ, সিংহ, হাতির মতো বড় প্রাণী। অনেক খাঁচা পড়ে আছে ফাঁকা। ফলে পশুপাখি দেখার প্রত্যাশা নিয়ে এখানে আসা দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশকে হতাশ হয়েই ফিরতে হচ্ছে। একসময় রাজশাহী শহর তো বটেই, উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছেও বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। শিশুদের কাছে চিড়িয়াখানা মানেই ছিল বাঘের গর্জন, সিংহের বিচরণ, হাতির বিশাল শরীর, হরিণের ছুটে চলা আর নানা প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির। পরিবার নিয়ে ছুটির দিনে এখানে ভিড় জমাতেন নগরবাসী।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও কমেছে প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য। বিশেষ করে বড় প্রাণী না থাকায় চিড়িয়াখানাটির মূল আকর্ষণ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের জুনে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে একটি বাঘ আনা হয়েছিল, যার নাম দেয়া হয়েছিল ‘সম্রাট’। এর আগে এখানে সিংহ ও সিংহীও ছিল। উট, হায়েনাসহ বিভিন্ন প্রাণী থাকার কথাও পুরোনো নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই প্রাণীগুলো আর নেই। বড় প্রাণীদের জন্য তৈরি করা খাঁচাগুলোও এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারহীন পড়ে আছে। বর্তমানে চিড়িয়াখানায় চিত্রা হরিণ, বানর, ঘড়িয়াল, খরগোশসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও মাছ রয়েছে। তবে দর্শনার্থীদের বড় অভিযোগ, প্রাণীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে প্রজাতির বৈচিত্র্যও। বিশেষ করে বাঘ, সিংহ, হাতির মতো বড় প্রাণী না থাকায় শিশুদের আগ্রহ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। ফলে জায়গাটি চিড়িয়াখানার চেয়ে পার্ক হিসেবেই বেশি পরিচিতি পাচ্ছে বলে মনে করছেন দর্শনার্থীরা।

সরজমিন দেখা যায় চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা শিশু আদিব রহমান জানায়, বাঘ ও সিংহ দেখার আগ্রহ নিয়েই সে পরিবারের সঙ্গে এখানে এসেছে। কিন্তু এসে বাঘ-সিংহ না পেয়ে তার মন খারাপ হয়েছে। তার ভাষায়, টেলিভিশন ও বইয়ে বাঘ-সিংহ দেখেছে, কিন্তু সামনে থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল। এখানে এসে হরিণ, বানরসহ কয়েকটি প্রাণী দেখেছে। তবে বড় প্রাণীগুলো থাকলে চিড়িয়াখানায় ঘোরার আনন্দ আরও বেশি হতো। শিশুদের সঙ্গে আসা অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, বাচ্চারা চিড়িয়াখানায় আসার আগে থেকেই বাঘ, সিংহ, হাতি ও হরিণ দে খার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু এখানে এসে যখন জানতে পারে বাঘ-সিংহ নেই, তখন তাদের আগ্রহ অনেকটাই কমে যায়। শিশুদের প্রধান আগ্রহ প্রাণী দেখায়। তাই প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে রাজশাহী চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১৩ই জুলাই রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, একসময় রাজশাহীর মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই উদ্যান ও চিড়িয়াখানা। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে এর ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুব শিগগিরই একটি বিশেষজ্ঞ দল রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করবে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, বর্তমান চিড়িয়াখানার জায়গা সীমিত। এই সীমিত জায়গায় সরাসরি বড় আকারের সাফারি পার্ক পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই জায়গাটির আয়তন, প্রাণীদের প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, নিরাপত্তা, খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার সক্ষমতা বিবেচনা করেই প্রাণী নির্বাচন করতে হবে। কিছুসংখ্যক প্রাণী আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে শুধু প্রাণী এনে খাঁচায় রাখলেই হবে না; প্রাণীর কল্যাণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।