অধিক লাভের আশায় কৃষি জমিতে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’

অধিক লাভের আশায় কৃষি জমিতে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’

ফন্ট সাইজ:

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির এলাকা সম্প্রসারণের খবরে জমি অধিগ্রহণের সময় বেশি লাভের আশায় কৃষি জমিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে দুই শতাধিক বহতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
পার্বতীপুরে হামিদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর পাশে বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি গ্রামে তিনতলা থেকে চারতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবনের বেশির ভাগই বিল্ডিং কোড, নকশা অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, যাতায়াতের রাস্তা নেই, মানুষের বসবাস নেই, বেশিরভাগই জনশূন্য। এলাকায় এসব ভবনকে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ বলা হচ্ছে। অনেক ভবনের মূল ফটকে ঝুলছে তালা। তারপরও প্রতিদিন নতুন নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে।

সরজমিন দেখা যায়, ফসলি জমির মাঝখানে অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য ভবন তৈরি করা হয়েছে। ওই এলাকায় সংবাদকর্মী বা কেউ ছবি কিংবা ভিডিওধারণ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়।
খনি কর্তৃপক্ষ, উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর কাজিপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় খনি সম্প্রসারণের জন্য প্রথমে তিনশ’ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খনির উত্তরে ২০২৪ সালের ১৮ই ডিসেম্বর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের জন্য তিনশ’ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন পায় এবং ২০২৬ সালের ২০শে মে খনির পূর্ব-দক্ষিণ পার্শ্বের আরও অতিরিক্ত ১ দশমিক ৩৬ একর অনুমোদনের হয়। এ খবর জানাজানি হলে পাল্লা দিয়ে চিহ্নিত এলাকায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের শুরু হয়।

বাশঁপুকুর ও কাজিপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, অধিক ক্ষতিপূরণের আশায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনামে বা দালালদের মাধ্যমে এসব নির্মাণ কাজে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। সেখানে নির্মাণ কাজে কর্মরত এক রাজমিস্ত্রি বলেন, প্রায় ৩০ শতক জমির উপর একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং ভবনটির মালিক কয়লা খনির এক কর্মকর্তা।
একটি সূত্র জানায়, সার্ভে করতে গিয়ে দেখা যায়, খনির ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় দালাল চক্রের যোগসাজশে বহুতল গড়ে উঠেছে।

কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলম জানান, আমি বিল্ডিং ও গুদাম করিনি, আমার স্ত্রীর নামে সমপ্রসারণ এলাকায় জায়গায় ছিল, সেখানে তার নামে গুদাম ঘর রয়েছে। খনির আরেক কর্মকর্তা (ব্যবস্থাপক-সাবসিডেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) মুহাম্মদ আক্কাছ আলী চৌহাটি গ্রামে নির্মাণ করেছেন দুইতলা বাড়ি। তবে ওই কর্মকর্তা জানান, আমি সমপ্রসারণ এলাকায় কোনো বাড়ি করেনি, আমার জায়গা নেই সমপ্রসারণ এলাকায়। তাছাড়াও বাড়িগুলোর মালিক খনির কর্মকর্তা, কর্মচারী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর আন্দোলনের নেতা ইব্রাহম খলিল, বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালীরাও রয়েছেন।

এ ব্যাপারে বসতবাড়ি রক্ষা কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মাদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, খনির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় মানুষ এ কাজে উৎসাহিত হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, এসব ব্যাপারে এলাকাবাসী অনেক অভিযোগ দিয়েছে। বিল্ডিং কোড না মেনে এসব বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওইসব এলাকার খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য আরও ৩০১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এখন প্রয়োজনীয় সার্ভে কাজ চলছে। অধিগ্রহণের আগেই তো খনির উত্তর দিকের বাশঁপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটিতে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। অধিগ্রহণ এলাকায় খনির কোনো কর্মকর্তার ভবন নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থার নেয়া হবে।