বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের পর দেশ আবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে ফিরে আসে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।
ক্যালেন্ডারের হিসাবে সরকারের ছয় মাস এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে নির্বাচনোত্তর সময় ধরে নতুন সরকারের প্রায় ছয় মাসের পথচলার একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন এখন করাই যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সময়ে বিএনপি সরকার দেশ কেমন চালালো? মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল, তার কতটা বাস্তবে দৃশ্যমান হয়েছে?
এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন। সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তি ও আশার আভাস পাওয়া গেছে। আবার মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা মানুষের প্রত্যাশাকে বারবার হতাশ করেছে। সরকার দিক পরিবর্তনের বার্তা দিতে পেরেছে; কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন, কিন্তু পুরোনো সংস্কৃতি কি বদলেছে?
বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হলো নির্বাচিত শাসনের ধারায় প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে দেশে নির্বাচন, সংসদ ও বিরোধী রাজনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সরকার ও সক্রিয় সংসদের ফিরে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
জাতীয় সংসদ আবার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্ন সংসদে আলোচিত হচ্ছে। তবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন ও সংসদীয় বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে সংস্কারের বিরাট সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিপদও রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি সরকারই দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা মুছে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে বারবার।
তারেক রহমানের সরকার যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে নয়, সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে কাজ করবে।
এ পর্যন্ত সরকার সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করেছে। কিন্তু কথার চেয়ে বাস্তবায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে ব্যক্তির সদিচ্ছা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
অর্থনীতিতে স্থিতির আভাস, বাজারে স্বস্তি নেই
অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ জুলাই মাসে প্রায় ২৭ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা ১৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে।
তবে এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব বর্তমান সরকারের একার নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হয়েছিল। বিএনপি সরকারের কৃতিত্ব হলো, তারা এখন পর্যন্ত সেই ইতিবাচক ধারাকে ধরে রাখতে পেরেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট দিয়েছে। এতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয়, বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির ব্যবধান যথেষ্ট বড়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকট প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
সাধারণ মানুষ অবশ্য অর্থনীতির বিচার রিজার্ভ বা জিডিপি দিয়ে করে না। তারা বিচার করে বাজারের ব্যাগ দিয়ে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, সবজি, ওষুধ, বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় এখনো সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও মানুষের প্রকৃত আয় সেই হারে বাড়েনি।
অর্থনীতির কাগজে কিছু স্বস্তি এলেও রান্নাঘরে তার প্রতিফলন নেই। এটাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। কারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির আগে আজকের খাবারের মূল্য জানতে চায়।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান দুর্বলতা
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে মানুষের অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, শিল্পাঞ্চল থেকে গ্রাম দীর্ঘ লোডশেডিং, গ্যাসের নিম্নচাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা জনজীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে।
দেশের কোনো কোনো এলাকায় দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছানোর খবর এসেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকান, বাজার ও বিপণিবিতান রাত আটটার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশই বলে দেয় সংকট কতটা গভীর। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস নেই, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার এই পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দায়ী করছে। এসব যুক্তি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্ববাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহের অনিশ্চয়তাও সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটের কথা বলে সরকার অনির্দিষ্টকাল দায় এড়াতে পারে না। মানুষ জানতে চায়, সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা কী? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিয়েছেন। জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলার সহায়তাও চেয়েছেন।
এসব উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ধার করা অর্থ দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যার মূল কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়; ভুল পরিকল্পনা, অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলাও এর জন্য দায়ী।
চাহিদা ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে কাগজে উৎপাদনক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। নিষ্ক্রিয় বা কম ব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার পুরোনো ব্যবস্থাও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
সরকারকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় চুক্তিগুলো প্রকাশ করতে হবে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এসব চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় যাচাই করা জরুরি। স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং বিতরণব্যবস্থার অপচয় কমাতে হবে।
একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ, ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি এবং নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির কার্যকর পথ তৈরি করা প্রয়োজন। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকলে বিনিয়োগ বাড়বে না, রপ্তানি সক্ষমতা কমবে এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হবে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারলে সরকারের অন্যান্য অর্জনও লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাবে।
এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কোন পথে?
নির্বাচনের আগে বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের মধ্যে বড় ধরনের আশা তৈরি করে। সরকারের প্রায় ছয় মাস পার হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য রূপরেখা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়।
সরকার বিভিন্ন প্রকল্প, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা বলছে। কিন্তু কোন খাতে, কত সময়ে, কত মানুষের জন্য এবং কী ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা দরকার।
সরকারি চাকরি দিয়ে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। এর জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, জাহাজ নির্মাণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিস্তার প্রয়োজন। বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও জরুরি।
উচ্চ সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বিনিয়োগের পথ আটকে দিচ্ছে। যে তরুণসমাজ বৈষম্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল, তারা শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্ন শুনতে চায় না বর্তমানে কাজের সুযোগ দেখতে চায়।
আইনশৃঙ্খলা ও দলীয় প্রভাব: ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই
একটি সরকারের সাফল্য শুধু বাজেট, রিজার্ভ কিংবা বড় প্রকল্প দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন নাগরিক রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন কি না, একজন ব্যবসায়ী চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করতে পারেন কি না এবং একজন ভিন্নমতের মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারেন কি না সুশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানে।
নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। প্রশাসনের কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, দলীয় কোন্দল ও সহিংসতার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার বড় প্রমাণ। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় দেখে প্রশাসন নীরব থাকলে জনগণের কাছে পরিবর্তনের সব প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিএনপির সামনে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দলীয় কর্মীদের অপরাধ আড়াল করা শুরু হলে সরকার ও দলের মধ্যকার সীমারেখা দ্রুত মুছে যাবে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, দল যখন রাষ্ট্রের ওপর চেপে বসে, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পাশাপাশি দলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কি সবার জন্য সমান?
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। সাবেক সরকারের সময় পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা বিপুল অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৫ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ হওয়ার খবরও কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যেন শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। সাবেক সরকারের দুর্নীতির বিচার হবে, কিন্তু বর্তমান সরকারের কেউ দুর্নীতি করলে তিনি ছাড় পাবেন এমন ধারণা তৈরি হলে পুরো অভিযান বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।
মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়িক সহযোগী কিংবা দলীয় নেতা পরিচয় যা-ই হোক, দুর্নীতিতে জড়িত হলে একই আইন প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিপক্ষের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; নিজের ঘরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত রাজনৈতিক সাহস।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: নতুন সরকারের পুরোনো পরীক্ষা
নতুন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আলোচনা ও সমালোচনার পরিসর কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ দূর হয়নি। ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুরোনো মামলা, নিবর্তনমূলক আইনের ধারা, নজরদারি, হুমকি এবং হামলার বিচারহীনতা এখনো উদ্বেগের বিষয়। সরকার যদি সত্যিই আগের শাসনব্যবস্থা থেকে আলাদা হতে চায়, তাহলে তাকে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।
শুধু প্রশংসা করে এমন গণমাধ্যম কোনো সরকারের উপকার করে না। স্বাধীন ও সমালোচনামুখর সংবাদমাধ্যম সরকারকে ভুলের বিষয়ে সতর্ক করে এবং রাষ্ট্রকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য: ভারতের বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো বাংলাদেশকে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভারতকেন্দ্রিক কূটনৈতিক বৃত্ত থেকে বের করে আনার চেষ্টা। বিগত সরকারের সময় দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেশের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ভারতের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে অতিমাত্রায় যুক্ত হয়ে পড়েছে।
তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, বাণিজ্যবৈষম্য, অশুল্ক বাধা এবং অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বিপরীতে ঢাকা দিল্লিকে যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতা দিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রত্যর্পণের প্রশ্নও এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় পরীক্ষা।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বক্তব্য “বাংলাদেশের স্বার্থই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে” একটি তাৎপর্যপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাঁর সরকারের লক্ষ্য ভারতবিরোধী হওয়া নয়; বরং ভারতের একচেটিয়া প্রভাব কমিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, পাকিস্তান, তুরস্ক, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করা।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক মহল থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতায় ফুটবল হতে চায় না; বরং প্রয়োজনে সহযোগিতার সেতু হতে চায়। এটি মূলত “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতিরই প্রকাশ।
তবে ভারতের বৃত্ত ভাঙার অর্থ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে ফেলা নয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ আমদানি, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি তৈরি সম্ভব নয়। ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।
দিল্লির ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে গিয়ে বেইজিং কিংবা অন্য কোনো শক্তির ওপর নতুন করে অতিনির্ভরতা তৈরি হলে সেটি স্বাধীন কূটনীতি হবে না শুধু নির্ভরতার কেন্দ্র বদলাবে।
তারেক রহমান সরকারকে তাই একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হচ্ছে। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তি, দল বা বিশেষ সরকারের বন্ধন থেকে বের করে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিণত করা। দ্বিতীয়ত, ভারতকে স্পষ্ট করে দেওয়া যে বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্য স্বার্থ।
আগস্টে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির কথা বলেছেন। এতে বোঝা যায়, সরকার দিল্লির সঙ্গে সংঘাত চায় না; শর্তহীন আনুগত্যের পরিবর্তে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস চায়।
এই নীতির সফলতা অবশ্য বক্তব্য দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে বিচার হবে। তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার, ভিসা পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো বিষয়ে অগ্রগতি হলে মানুষ নতুন কূটনীতির বাস্তব মূল্য বুঝতে পারবে।
চীনা বিনিয়োগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও ঋণের শর্ত, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা এবং নিরাপত্তাগত প্রভাব স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সময় ১৯৭১ সালের ইতিহাস ও বাংলাদেশের মানুষের সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করা যাবে না।
বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম পথ ভারতবিরোধিতা কিংবা চীননির্ভরতা নয়; কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। যে বিষয়ে ভারতের সঙ্গে স্বার্থ মিলবে সেখানে সহযোগিতা, যে বিষয়ে মতবিরোধ থাকবে সেখানে দৃঢ় আলোচনা এবং যেখানে বিকল্প অংশীদার প্রয়োজন সেখানে বহুমুখী সম্পর্ক এই নীতিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের কূটনীতির ভিত্তি।
ভারতের বৃত্ত ভাঙার প্রচেষ্টা তখনই সফল হবে, যখন বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির উপগ্রহ না হয়ে নিজের স্বার্থে সবার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারবে। তারেক রহমান পরিবর্তনের ভাষা তৈরি করেছেন; এখন তাঁর সরকারের পরীক্ষা হলো সেই ভাষাকে কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দেওয়া।
পথ বদলেছে, কিন্তু গতি কি যথেষ্ট?
বিএনপি সরকারের প্রায় ছয় মাসকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা যেমন অন্যায়, তেমনি অসাধারণ সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরাও বাস্তবসম্মত নয়। নির্বাচিত শাসন ফিরে এসেছে, অর্থনীতিতে কিছু স্থিতির আভাস দেখা যাচ্ছে, রিজার্ভ বেড়েছে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ভাষা সরকারি নীতিতে জায়গা পেয়েছে এগুলো ইতিবাচক।
অন্যদিকে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা, দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা এবং গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা সরকারের অর্জনের ওপর ছায়া ফেলছে।
প্রথম ছয় মাসে সরকার তার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু জনগণ এখন ফলাফল দেখতে চায়। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেয়নি; বরং তার দায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে।
পাঁচ বছর পর এই সরকারের মূল্যায়ন কতটি সেতু, সড়ক বা ভবন নির্মাণ করেছে তা দিয়ে হবে না। মূল্যায়ন হবে তারা ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে পেরেছে কি না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলের ঊর্ধ্বে তুলেছে কি না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের ঘরেও ব্যবস্থা নিয়েছে কি না এবং সাধারণ মানুষের জীবন কিছুটা সহজ করেছে কি না তার ভিত্তিতে।
ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির রাজনৈতিক বিজয়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হতে হলে তাকে প্রমাণ করতে হবে সে শুধু আগের সরকারের বিকল্প নয়, আগের শাসনসংস্কৃতিরও বিকল্প।
ছয় মাসের প্রাথমিক হিসাব তাই সরকারের জন্য একই সঙ্গে আশা ও সতর্কবার্তা। পথ কিছুটা বদলেছে, কিন্তু গতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। জনগণ সরকারকে সময় দিতে প্রস্তুত; তবে সেই সময় সীমাহীন নয়।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
