একটি প্রকল্প নিয়ে ‘বেলা’র রহস্যজনক নীরবতা

ফন্ট সাইজ:

সিলিকন সিটি। সাভারের আমিন বাজার ইউনিয়নের বড়দেশী মৌজায় প্রায় ৭০০ একর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্পটি। অন্তত  দশটি ব্লকে বিভক্ত এই সুবিশাল হাউজিংয়ে আধুনিক সব সুবিধা রাখার পরিকল্পনা আছে। ওয়াকওয়ে, থিয়েটার, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, শপিংমল, কাঁচাবাজার, পাইকারি মার্কেট, খেলার মাঠ, শিশুপার্ক, ওয়াটার ও বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, স্টেডিয়াম, আনসার ক্যাম্প সবই আছে। হাউজিংয়ের অবকাঠামো কাজও প্রায় শেষ। ইতিমধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খেলার মাঠ প্রস্তুত। তবে বিপত্তি বেঁধেছে এর বৈধতা নিয়ে। রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ড্যাপের চিহ্নিত বন্যাপ্রবাহ এলাকা, জলাধার, কৃষিজমি ও প্রবাহিত খাল ভরাট করে গড়ে ওঠা সিলিকন সিটি বন্ধের দাবিতে আমিনবাজার এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিক চিঠিও দিয়েছেন। একাধিকবার মানববন্ধন করেছেন। বিক্ষোভও হয়েছে। আন্দোলনকারীরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে ওই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি ‘বেলা’। ২০২৪ সালের এপ্রিলে সিলিকন সিটির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করে সংগঠনটি। মামলা নং-৫৩৮৪/২৪। প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই বছরের ২৬শে মে সিলিকনের অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদেশে ওই প্রকল্পের মাটি ভরাট, প্লট বিক্রি ও রেজিস্ট্রেশনসহ সব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়। সরজমিন দেখা গেছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও হাউজিংয়ের নির্মাণকাজ চলমান। প্রকল্পটির বিভিন্ন ব্লকের রাস্তায় এখনো ইট, বালু, খোয়া এনে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। শ্রমিকরা কাজ করছেন। মালিকপক্ষের আনাগোনা দেখা গেছে। নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। কয়েকটি ব্লকে সাব-রাস্তা তৈরি হচ্ছে। প্লট, ফ্ল্যাট ও জমির শেয়ার ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। কেউ প্লট কিনতে এসেছেন। কেউ আবার শেয়ারে ফ্ল্যাট কিনতে। মালিকের লোকজন ক্রেতাদের ঘুরে ঘুরে প্লট দেখাচ্ছেন। একটু দূরে দূরে জমি বিক্রির বড় বড় সাইনবোর্ড লাগানো। কোনো প্রকার বাধাহীনভাবে চলছে সিলিকন সিটির কার্যক্রম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেলা’র পক্ষে উচ্চ আদালত আদেশ দেয়ার পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও আদেশের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। এই বিষয়ে বেলা কোনো তদারকিও করেনি। ৫ই আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা করা হয় বেলা’র নির্বাহী পরিচালক ড. রিজওয়ানা হাসানকে। দায়িত্ব পেয়ে পরিবেশ রক্ষায় তিনি নানা পদক্ষেপ নিলেও সিলিকন সিটি নিয়ে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে তার নাটকীয় নীরবতা দেখা গেছে। একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা হয়েও তার মেয়াদে কেন সিলিকন সিটির মতো একটি অবৈধ হাউজিংয়ের কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেননি। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। কেউ কেউ গোপনে বেলা’র সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন। সব জায়গায় সাঁড়াশি অভিযান চালালেও কেন সিলিকন সিটিতে আটকে ছিলেন রিজওয়ানা হাসান? কেন তিনি সিলিকন সিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি। এ নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

আদেশের পরে বেলা’র ভূমিকা কী: অন্যান্য মামলার মতো বেলা সিলিকন সিটির মামলার আদেশ বাস্তবায়নে কোনো তদারকি ও নজরদারি করছে কিনা তা জানার চেষ্টা করে মানবজমিন। তবে বেলা’র ওয়েবসাইট ঘেঁটে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনিতে দেশের যেকোনো প্রান্তে পরিবেশ সংশ্লিষ্ট মামলায় বেলা’র পক্ষে আদালতের কোনো আদেশ আসলে তা নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেখানে মামলার বিশদ বিবরণ দেয়া থাকে। কিন্তু সিলিকনের মামলার কোনো তথ্য বেলা’র ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি। পরে বেলা’র আইনজীবীকে ফোন করে সর্বশেষ তথ্য জানতে চাওয়া হয়। বেলা’র আইনজীবী এডভোকেট এস হাসানুল বান্না মানবজমিনকে বলেন, সিলিকনের উপর নিষেধাজ্ঞা আছে। আমরা মামলাটি চূড়ান্ত শুনানি করানোর চেষ্টা করছি। তবে কবে পারবো তা বলতে পারছি না। এ বিষয়ে বেলা কোনো তদারকি করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে আমরা তো আর কর্তৃপক্ষ না। তাই আমরা কোনো নজরদারি বা তদারকি করছি না। আমরা শুধু আদালতের আদেশের বিষয়ে তাদের জানিয়েছি। এর বাইরে কিছু করিনি। আদালতের আদেশের পরেও সবকিছু চলছে, তারপরেও আপনারা বিষয়টি আদালতের নজরে আনছেন না কেন- জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, না আমরা এই বিষয়ে আর কিছু করিনি। অন্য কাজের অনেক চাপ আছে তো তাই কনটেম্পট করা হয়নি। আসলে এটা তো আর রাতারাতি উচ্ছেদের বিষয় না, সবাইকে নিয়েই চলতে হয়। তাদেরও সময় দিতে হবে। সিলিকন সিটির দায়িত্বে থাকা মো. মেহেদি হাসানকে ফোন করা হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, সিলিকনে আপাতত কোনো কাজ চলছে না। ব্যক্তিমালিকরা করছেন। যারা জমি কিনেছে তারা করছেন। এতে আমাদের কোনো হাত নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন