লজিস্টিকস খাতে বিদেশি কোম্পানির বাড়তি সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি

সিএসআর’র সেমিনারে বক্তরা

লজিস্টিকস খাতে বিদেশি কোম্পানির বাড়তি সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি

ফন্ট সাইজ:

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের মতো লজিস্টিক খাতে বিদেশি যৌথ মালিকানার কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের মুনাফা দেশ থেকে নিয়ে যাবে ওই বিদেশি প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসার পুরোটা বিদেশিদের হাতে চলে গেলে দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানি যেকোনো সময় সংকটের মুখে পড়তে পারে। তাই খসড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালায় বিদেশি মালিকানার সীমা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকরা। বুধবার ঢাকার মহাখালীস্থ ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’- শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) এই সেমিনারের আয়োজন করে।

বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স এসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ-এর (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এটিএম আজিজুল হক (ডেভিড)। মূল প্রবন্ধে সিএসআর’র নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালা সংশোধন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বর্তমানে যৌথ মালিকানায় বিদেশি কোম্পানির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ৪০ শতাংশ। বিধিমালা সংশোধনের খসড়ায় বিদেশি কোম্পানির ৬০: ৪০ ইক্যুইটি কাঠামো শিথিল করে ৫১: ৪৯ করার প্রস্তাব রয়েছে। এমনকি শতভাগ বা ৪০ শতাংশের অধিক বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের পথ খুলে দেয়ার উদ্যোগও বিবেচনাধীন বলে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে নতুন লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে শতভাগ বিদেশি মালিকানা করেছিল সরকার। সে সময় যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪৯ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নামানো হয়।
সাকিব আনোয়ার বলেন, ইতিমধ্যে শিপিং এজেন্ট ও কাস্টমস এজেন্ট বিধিমালায় ৬০: ৪০ থেকে ৫১: ৪৯ অনুপাতে প্রণয়ন করা হয়েছে।

আইসিডি ও অফ-ডকে ৪৯ শতাংশ মালিকানার সুযোগ পেয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এখন লজিস্টিকস খাতে যে মান স্থির হবে তা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সেবা খাতেও অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ড কোম্পানি বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার কোনো জাহাজ বা বিমানের মালিক নন; বরং পণ্য প্রেরক ও বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সেতুবন্ধ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি স্বল্প সম্পদভিত্তিক সেবাশিল্প। এখান থেকে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো সুফল পায় না দেশ- এমন তথ্য উল্লেখ করেন সিএসআর’র নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এই ব্যবসায় প্রবেশে প্রকৃত খরচ কার্যত শূন্য। শাখা কার্যালয়ের ক্ষেত্রে বিডার অনুমোদনের পর দুই মাসের মধ্যে ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স আকারে আনতে হবে। এটিই একমাত্র মূলধনি শর্ত। এটি বিনিয়োগ নয়, অফিস পরিচালনার ব্যয়।

সাকিব আনোয়ার আরও বলেন, এজেন্সি ব্যবসায় দেশীয় মালিকানা বাধ্যতামূলক করার নজির বাংলাদেশে নতুন নয়। যেখানে এটা করা হয়েছে সেখানেই সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বেড়েছে। সেই তুলনায় ৬০ শতাংশের দাবি অত্যন্ত মধ্যপন্থি, এটি বিদেশি অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে না, কেবল নিয়ন্ত্রণ দেশীয় হাতে রাখে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় কোনো বিনিয়োগ না করেই মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে। তবু দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখন যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৬০ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে, এটা সারপ্রাইজিং। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সচেতনতা নেই, সেটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা দরকার।’

বাফা সভাপতি মো. আরিফুল আহসান বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে ১ হাজার ২৫০ সদস্যের মধ্যে ১৩টি বিদেশি মালিকানা ও ৩০-৩৫টি যৌথ মালিকানার রয়েছে। তারাই ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ২০ শতাংশ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান। অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই। আইনজীবী এম সাকিবুজ্জামান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেই স্থানীয় এজেন্টরা দৌড়ের ওপর থাকেন। ব্যবসা ও রাজনীতি এক হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন জাহাজে থাকা পণ্য কে হ্যান্ডেল করবে, তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান দুশ্চিন্তায় থাকেন। এ জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

সংসদ সদস্য ফজল হুদা বলেন, ‘নওগাঁ থেকে কাওরান বাজারে এক ট্রাক আলু আনতে খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। নওগাঁ থেকে রেললাইন নির্মাণে বিনিয়োগ করতে চাইলে আমরা শতভাগ মালিকানার বিদেশি কোম্পানিকে স্বাগত জানাবো। কিন্তু ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কেন কাগজ বেঁচে খাবেন। আমরা মনে করি, যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪০ শতাংশ থাকা উচিত। ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে দেশি কোম্পানিকে সুরক্ষা দিতে বিদেশি কোম্পানির জন্য কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন