দ্রব্যমূল্য, সুশাসন ও কর্মসংস্থান: নতুন সরকারের কাছে নাগরিকদের প্রধান দাবি

ফন্ট সাইজ:

সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি পোড় খাওয়া ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশার পারদ এখন অনেক উঁচুতে। নির্বাচন উপলক্ষে যে প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে দেয়া হয়েছে এবং দলের ইশতেহারে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে। সাধারণ জনগণ আশা করছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা এবং বেকারত্ব দূর করার জন্য কার্যকর কর্মসংস্থান পরিকল্পনা নেয়া হবে।
নগরের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমার আশা, দেশের প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ, আইন প্রয়োগ হবে সমানভাবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকবে দৃশ্যমান কঠোরতা। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং প্রশাসনের সামগ্রিক সক্ষমতা ও স্বাধীনতাও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাই নতুন সরকার এসব বিষয়ে প্রাধান্য দিবে বলে আমার আশা।
প্রায় তিন বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালান সেলিম। কুমিল্লার মুরাদনগরে তার বাড়ি। বর্তমানে হালিশহর এলাকায় তার বসবাস। রিকশাচালক সেলিম বলেন, ‘তারা (বিএনপি) তো কার্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একটা কার্ড পেলে আমার উপকার হতো। আমরা গরিব মানুষ। কার্ড পেলে সংসারটা চালিয়ে নিতে পারতাম।’
নগরের প্রবর্তক এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, রমজান মাসে মানুষকে স্বস্তি দেয়া সরকারের প্রথম কাজ। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আগামী দুই বছর যেন এসব সেবার মূল্য বৃদ্ধি না করা হয়Ñসরকারকে এখনই সে বিষয়ে পরিষ্কার ঘোষণা দিতে হবে। নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার সিএনজি অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ নবী বলেন, ‘আমরা দেশের উন্নয়ন চাই। দেশ ভালোভাবে চলুক সেটিই আমাদের চাওয়া। সিএনজি চালক হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। কোথাও গাড়ি রাখতে গেলেই চাঁদা দিতে হয়, গাড়ি থামিয়েও চাঁদা নেয়া হয়, নতুন সরকার যেন এসব বন্ধ করে সেটি আমাদের প্রাণের দাবি। জিনিসপত্রের দাম কমলে আমরা বাঁচি। বাজারে গেলে ভয় লাগে। আয় বাড়ে না, খরচ বাড়ে। আমাদের চাওয়া যাতে আয় বাড়ে ও জিনিসপত্রের দাম কমে।’ নগরের জিইসি মোড় এলাকায় কথা হয় মাইক্রোচালক মো. ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার যেন ন্যায়ের পক্ষে থাকে। জনগণের পক্ষে থাকে। সব কিছুতে দরিদ্র মানুষ ও সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকে। সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা সরকারকে পূরণ করতে হবে। এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা আছে, কর্মসংস্থান নেই। কাজ না পেয়ে সবাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। মেধা চলে যাচ্ছে। কারণ বিদেশে কিছু একটা করলেও পরিবারকে সুখে ও শান্তিতে রাখা যায়। ফলে নতুন সরকারকে কর্মসংস্থানে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।’ নাবিলা আলম চৌধুরী নামে এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নবগঠিত সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা শুধু উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়; বরং মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ একটি প্রকৃত নারীবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীÑএই বিপুল জনশক্তিকে দক্ষভাবে গড়ে তুলে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এতে যেমন টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে নারীর অংশগ্রহণও বাড়বে। নারীর পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাস্তাঘাট, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্যসেবায়, বিশেষ করে গর্ভকালীন ও মাতৃকালীন সেবায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। মোহাম্মদ রেজাউল করিম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, নবাগত সরকারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সবল করে তুলতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অনাস্থাসহ দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশে পার্শ্ববর্তী সব দেশ থেকে কম। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসা ও ব্যক্তি পর্যায়ে কর প্রদানের প্রক্রিয়াকে ঝামেলা ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। সরকারকে ব্যয় সংকোচনের নীতি গ্রহণ করে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন