পাবনায় ভূমি অফিসে নজিরবিহীন দুর্নীতি

ফন্ট সাইজ:

পাবনার ভূমি প্রশাসনে সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ জালিয়াতি ও দুর্নীতির ঘটনা। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক একটি জমিকে গোপনে ‘ক’ তফসিল (অর্পিত সম্পত্তি) ভুক্ত করা হয়। এরপর সেই তথ্য গোপন রেখে একই জমি আবার নিষ্কণ্টক দেখিয়ে বিক্রি করা হয়। এই মহাজালিয়াতির সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তার অভিযোগ, পাবনা সদর উপজেলার টেবুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তৎকালীন ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম সরাসরি এই জালিয়াতি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ঘুষ না পেয়ে ক-তফসিলে ঢুকিয়ে দেয়ার অভিযোগ। ইসমাইল হোসেন জানান, সব কাগজপত্র যাচাই করে আইনানুগভাবে জমি কেনার পর পুনরায় খাজনা দিতে গেলে তার কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই জানানো হয় জমিতে ভেজাল আছে। পরে তিনি জানতে পারেন, ২০১২ সালে গোপনে জমিটি ক-তফসিলভুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে পাবনা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জমিটি বৈধভাবে রেজিস্ট্রি হয়। আরএস খতিয়ানভুক্ত রেকর্ডীয় মালিকের নামে জমি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৩-১৪ সালে উত্তরাধিকারীদের নামে নামজারি ও খাজনা গ্রহণ করা হয়। ২০১৪ সালে ড. ইসমাইল হোসেনের নামে নামজারি মঞ্জুর ও খাজনা গ্রহণ করা হয়। সবকিছু বৈধ থাকা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠেছে একই প্রশাসনের অধীনে ২০১২ সালে কীভাবে সেই জমি ক-তফসিলে রূপান্তর করা হলো। তদন্তে উঠে আসে, জমির মালিকের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তা জমিটি ক-তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মালিকপক্ষ মামলা করার হুমকি দিলে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নতুন কৌশল নেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক- তফসিলের তথ্য গোপন রেখে জমিটি বিক্রি করে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করতে বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। এই প্রতারক চক্রের ফাঁদেই পড়ে ২০১৪ সালে জমিটি কিনে সর্বস্বান্ত হন ইসমাইল। জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন। ২০১৭ সাল থেকে একাধিকবার আবেদন করলেও তিনি কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। ২০২২ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জমিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হওয়ায় পুনরায় ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ সম্ভব নয়। ইসমাইলের অভিযোগ, এ বক্তব্যের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় না এনে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি পুনরায় জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মহোৎসব এর অংশ হিসেবেই তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। এখনো প্রতিকার না পাওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবিতে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান। অভিযুক্ত ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (বর্তমানে ঈশ্বরদীর সাঁড়া ভূমি অফিসে কর্মরত) রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি টেবুনিয়া অফিসে যোগদানের আগেই ক- তফসিলের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। ক-তফসিলভুক্ত জমি কীভাবে নামজারি হলো এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সে সময় ডিসি অফিস থেকে গেজেটের কপি পাননি। পাবনার বর্তমান জেলা প্রশাসক ড. শাহেদ মোস্তফা বলেন, তার কাছে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন