প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য

প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার তাদের প্রিয় সন্তানকে হারায় পুকুর, খাল, ডোবা কিংবা নদীর পানিতে। এমন মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য হলেও প্রতি বছর হাজারো শিশুর জীবন ঝরে যাচ্ছে শুধু নিরাপদ তত্ত্বাবধানের অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতার কারণে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় পানিতে ডুবে মৃত্যু শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। একটি শিশুর অকাল মৃত্যু যেমন একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি তা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথেও বড় বাধা। এই বাস্তবতায়, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রারম্ভিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি- এই দুই লক্ষ্যকে এক করে সরকারের ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড চাইল্ডকেয়ার (আইসিবিসি) প্রকল্প একটি কার্যকর মডেল হিসেবে ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায়- ১৬ জেলায় ৮,০২০টি শিশু যত্নকেন্দ্রে ২ লাখের বেশি শিশু নিরাপদ তত্ত্বাবধানে থেকেছে এবং ৩.৬ লাখ শিশু সাঁতার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্যক্রমের আওতায় আসা শিশুদের মাঝে ডুবে মৃত্যু শূন্যের কোঠায়। কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক সচেতনতা- এই সমন্বিত উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এই সফল উদ্যোগের ধারাবাহিকতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: ২০২৪ সালে সম্পন্ন হওয়া ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশ- এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ৫১ জনেরও বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু। ঝুঁকির সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের বসতবাড়ির চারপাশের অসংখ্য উন্মুক্ত জলাশয়। শিশুদের ডুবে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে, যখন বাবা-মা বা অভিভাবকরা গৃহস্থালি কিংবা জীবিকার কাজে ব্যস্ত থাকেন। কয়েক মিনিটের অনুপস্থিতিই একটি পরিবারের জন্য আজীবনের শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যুকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় কিন্তু নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করেন। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী।

কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র: একটি কার্যকর সমাধান: গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগগুলোর একটি। এসব কেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিশুদের প্রশিক্ষিত সেবাদানকারীদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয়। তবে এই কেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খেলাধুলা, গল্প বলা, গান, সৃজনশীল কার্যক্রম এবং বয়সভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের জ্ঞানীয়, সামাজিক ও মানসিক বিকাশও সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ, এটি একইসঙ্গে শিশু সুরক্ষা ও প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশের একটি সমন্বিত মডেল।

এ ধরনের কেন্দ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করে। অভিভাবকরা কর্মব্যস্ত সময়ে নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, ফলে পারিবারিক উদ্বেগ কমে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা হিসেবে সাঁতার: বাংলাদেশের মতো পানিবেষ্টিত দেশে সাঁতার শেখা বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য জীবনদক্ষতা। বয়স উপযোগী নিরাপদ সাঁতার প্রশিক্ষণ শিশুদের পানিতে নিরাপদ আচরণ শেখায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত জীবনরক্ষাকারী সাঁতার 
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিশুরা শুধু সাঁতারই শেখে না; তারা পানিতে আত্মরক্ষার কৌশলও আয়ত্ত করে।

সচেতন পরিবার, নিরাপদ শিশু: শিশু সুরক্ষায় পরিবার ও কমিউনিটির ভূমিকার বিকল্প নেই। আইসিবিসি প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে অনেক এলাকায় অভিভাবকদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শিশুদের একা বাইরে যেতে না দেয়া, জলাশয়ের আশপাশে সতর্ক থাকা এবং নিয়মিত তত্ত্বাবধানের বিষয়ে তারা আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন।

এই সচেতনতার সংস্কৃতি যত বিস্তৃত হবে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর মতো প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনা তত কমে আসবে।
এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা: পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ কিংবা প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ- কোনোটিই স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের বিষয় নয়। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ, যার সুফল বহু প্রজন্ম ধরে পাওয়া যায়।

তাই কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কর্মসূচিকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে সরকারের রাজস্ব বাজেটের স্থায়ী কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। একইসঙ্গে এসব উদ্যোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (ঈঝজ) উদ্যোগের অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন সেই সাফল্যকে সাময়িক প্রকল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসূচিতে রূপ দেয়া।

কারণ প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য। আর প্রতিরোধযোগ্য কোনো শিশুমৃত্যুই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন