বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে যেক’টি সাহিত্যসাময়িকীর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তার অন্যতম হলো ‘কণ্ঠস্বর’। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত এই সাহিত্য পত্রিকা প্রথমে মাসিক ও পরে ত্রৈমাসিক, কখনো নিয়মিত এবং মাঝে মাঝে অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার আকার, পৃষ্ঠা সংখ্যা, বিভিন্ন সংখ্যা প্রকাশের কাল-ব্যবধান, নিয়ম-অনিয়ম সবকিছুকে তুচ্ছ করে এই পত্রিকা সাহিত্যের একটি নতুনধারা এবং উৎকর্ষের উচ্চতর মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই ধারার অন্যতম অভিযাত্রী হিসেবে সাহসী সাম্পান এগিয়ে চলেছে দীর্ঘকাল। পুরো প্রকাশকালব্যাপী আমাদের সাহিত্যে লেখক ও পাঠক তৈরিতে এর সামগ্রিক প্রভাব ছিল গভীর ও ব্যাপক।
যে লেখকদের এই সম্পাদক তার পত্রিকার পৃষ্ঠায় একত্রিত করেছিলেন তারা সকলেই তখন তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল লেখক, কবি ও সাহিত্যযাত্রী। কেউ কেউ নিজেদের প্রবন্ধের ভাষায় এবং আঙ্গিকে শিল্পসচেতনতা ও নান্দনিক শুদ্ধতার দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন। কেউ কথাসাহিত্য ও কবিতায় করেছেন অবক্ষয়ের আরাধনা। কেউ দ্রোহে ও প্রাণচাঞ্চল্যে উচ্চকিত, কেউ কেউ শানিত করেছেন তাদের সমাজদৃষ্টি ও ভাষা। আবদুল মান্নান সৈয়দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রফিক আজাদ থেকে শুরু করে আবদুল হাফিজ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা পর্যন্ত কতো অসংখ্য প্রিয় লেখক তখন কণ্ঠস্বর পত্রিকার পৃষ্ঠা আলোকিত করেছেন তার হিসাব করা কঠিন। যাদের হাতে সাহিত্যের কালান্তর সৃষ্টি হয়ে চলেছে এরকম দশ-পনেরো জন সাহিত্যিককে দিয়ে তাদের শ্রেষ্ঠ লেখা লিখিয়ে নেয়া আর অন্বিষ্টের পথে পদযাত্রায় তাদের একাগ্র ও জাগ্রত রাখার সবচেয়ে দুরূহ কাজটি সুচারুভাবে করেছেন সম্পাদক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
তার চেয়েও বিস্ময়কর মনে হয় কীভাবে তিনি তার সময়ের সবচেয়ে নবীন ও শানিত লেখকগোষ্ঠীর শিল্পসচেতন, প্রকরণপ্রবণ ও মননশীল (মতান্তরে কলাকৈবল্যবাদী) সাহিত্যধারার দিকে একটা বড় সংখ্যক পাঠককে আকর্ষণ করলেন। লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশ যতই মনোযোগ দাবি করুক একজন উচ্চ মেধার পরিশ্রমী সম্পাদক তা পূরণ করতে সক্ষম হন। কিন্তু সাহিত্যের একটি নতুন কালপর্বে নতুন প্রবণতা ও নতুন নিরীক্ষার জন্য সহস্র পাঠককে আগ্রহী ও উন্মুখ করে তোলার কাজটা কঠিন। একটি নতুন সাময়িকীর পক্ষে এ-অর্জন সহজসাধ্য ছিল না। সম্পাদক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এই দুইয়ের সমন্বয়সাধন।
পরিপাটি মুদ্রণ, সুচারু প্রুফ সংশোধন, উৎকৃষ্ট কাগজ নির্বাচন, কাঙ্ক্ষিত ও প্রিয় শিল্পীকে দিয়ে প্রচ্ছদ আঁকিয়ে নেয়া এসব জাগতিক কাজে সম্পাদক স্বয়ং কতোটা সময় দিয়েছেন তার বিবরণ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দিয়েছেন তার নিজের লেখা স্মৃতিকথনে, ‘ভালোবাসার সাম্পান’ বইয়ে। তার স্মৃতিকথায় বিস্তারিতভাবে রয়েছে পত্রিকার ব্যয়সংকুলানের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা কীভাবে একটু একটু করে তিনি সংগ্রহ করেছেন। সেই ষাটের দশকে আমাদের অর্থনীতির আকার ও বাণিজ্যজগতের আয়তন এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যে, এরকম একটি সাহিত্য পত্রিকার জন্য দরকারি টাকা বিজ্ঞাপন থেকে তুলে আনা যায়। সহায়তার জন্য কাউকে বেশিদিন পাওয়া যায়নি। নিজে সেই অল্প টাকার বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজে কীভাবে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন সেই গল্প সম্পাদক তার স্মৃতিকথায় বিস্তারিত লিখেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা হলো সেই সম্পাদক এতসব জাগতিক ও আর্থিক দায়দায়িত্ব পালন করেও তার পত্রিকার জন্য সেকালের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ লেখককে দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি লিখিয়ে নিতে পেরেছেন। সৃষ্টি করতে পেরেছেন সাহিত্যযাত্রার উচ্চতর মান। তার পরিশ্রমের প্রতিটি স্বেদবিন্দু সার্থক হয়েছে। এর জন্য যে অপরিসীম ত্যাগ তাকে করতে হয়েছে তা যেন আমরা ভুলে না যাই। ভালোবাসার সাম্পান সে-যুগের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্রে সৃজনশীলতার তরণী বেয়ে যাওয়া নাবিকের গল্প।
আজ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রবন্ধ, জার্নাল, স্মৃতিকথা, গল্প ও বক্তৃতার সংগ্রহ রচনার উৎকর্ষ ও পরিমাণ দু’দিক থেকেই বিস্ময়কর। অথচ তার লেখালিখির সূচনার সময়টি, যা হতে পারতো নিজের লেখার সবচেয়ে স্বর্ণপ্রসূ কাল, তিনি ব্যয় করেছেন সমসাময়িক অথবা তরুণতর লেখকদের জন্য। নবীন লেখককে হাত ধরে তুলে নিয়েছেন তার অলৌকিক জলযানে। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে তিনি উদ্দীপনা যুগিয়েছেন। তার জীবন- যৌবন সমর্পিত হয়েছিল নিজের পত্রিকার মধ্যদিয়ে সে-কালের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল দলটিকে নেতৃত্ব দেয়ার কাজে।
“একজন সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক শেষ পর্যন্ত একজন দলনেতাই। একটি সমবেত সাহিত্যযাত্রাকে তার এগিয়ে নিতে হয়। তাই তাকে চলতে হয় দেখে-বুঝে, পা ফেলতে হয় হুঁশিয়ার হয়ে। সবার মান রেখে, মন রেখে, সবাইকে খুশিতে রেখে, তাদের নিয়ে তাকে অভীষ্ট জয় করতে হয়। চারপাশের প্রতিটি লেখকের আলাদা চাহিদা জোগান দিতে হয় তার, আলাদা জিভের স্বাদ মেটাতে হয়। কাজটা সোজা নয়। এতগুলো ভিন্ন দেবতাকে তুষ্ট করা সত্যিই কঠিন। বিশেষ করে তারা যেখানে সবাই একেকজন দিগ্বিজয়ী তরুণ, মনের ভেতর প্রত্যেকেই জগতের শ্রেষ্ঠতম লেখক, অমরত্বের ব্যাপারে যাদের মনে সন্দেহের খড়কুটোও নেই।” (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ভালোবাসার সাম্পান, প্রথম প্রকাশ ২০০২ মাওলা ব্রাদার্স, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ঢাকা)।
ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন হয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছিলেন তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে। সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে সেই পালাবদলের কালপর্বে নবীন সাহিত্যযাত্রাকে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়ে সমন্বিত, সংহত ও বহমান করে রেখেছিলেন দীর্ঘ এক দশক ধরে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস যারা জানেন তারা এ-ও জানেন যে, গত শতাব্দীর মধ্য-ষাট থেকে মধ্য-সত্তর শুধু দশটি বছর নয়। এটা এক অভূতপূর্ব পালাবদলের কাল।
‘ভালোবাসার সাম্পান’ নামের এই স্মৃতিকথা থেকে পাঠক শুধু একটি পত্রিকার আনুপূর্বিক ইতিহাস জানতে পারবেন তা নয়। শুধু সেই কালপর্বের দ্রোহী ও সোচ্চার লেখকদের কথা বা ঐ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত লেখকগোষ্ঠীর সান্নিধ্যের অম্লমধুর গল্প পড়বেন তা-ও নয়। পাঠক একটা পালাবদলকে প্রত্যক্ষ করবেন। আলাদা করে সে সময়ের সকল প্রধান কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকারের চিন্তার পরিমণ্ডলকে ছুঁতে পারবেন। এমনকি ওই গোষ্ঠীর বাইরে দেশের অন্যধারার পত্রপত্রিকা বা দেশের বাইরের, বিশেষত কলকাতার প্রধান কবি ও সম্পাদকদের চিন্তা ও কাজ সম্পর্কে ধারণা পাবেন। আমেরিকার বিটনিক সাহিত্য ও পশ্চিমবঙ্গের কৃত্তিবাস-এর ধারা এতে বেশ কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। এ সময়ের কবি ও কথাসাহিত্যিকগণ তাদের দেশজ পূর্বসূরিদের তুলনায় বেশি আকৃষ্ট হয়েছেন পশ্চিমের প্রতি। প্রভাবান্বিত হয়েছেন পশ্চিমের কবি ও শিল্পীর জীবন, সাহিত্য-ভাবনা ও সৃষ্টির দ্বারা। অনুপ্রাণিত হয়েছেন পশ্চিমী সাহিত্য ও শিল্পকলার নতুন প্রবণতা ও শিল্প-আন্দোলন থেকে। এইসব মিলেমিশে ভালোবাসার সাম্পান একই সঙ্গে ইতিহাস ও কিংবদন্তি, উপন্যাস ও স্মৃতিকথা।
একজন সাহিত্যিক ও সম্পাদকের দীর্ঘদিনের অন্তরঙ্গ অবলোকনের চিহ্ন, তার মনোজগৎ, যুগান্তর সৃষ্টি করা সাহিত্য আন্দোলন আর তার বিচার-বিশ্লেষণ থেকে জন্ম নেয়া সারবস্তু, সজীব গদ্যে সমকালীন সাহিত্যসঙ্গীদের অন্তরঙ্গ পরিচয়- এইসব দিক থেকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালোবাসার সাম্পান’ বইটির সঙ্গে তুলনীয় আর অল্প কয়েকটি মাত্র বই বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে। সাগরময় ঘোষের স্মৃতিকথা বাদ দিলে উদাহরণ হিসেবে থাকবে দু’টি মাত্র বই। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘কল্লোল যুগ’ আর বুদ্ধদেব বসুর ‘আমাদের কবিতাভবন’।
বাংলাদেশের সাহিত্যসাময়িকীর ক্ষেত্রে তখনকার কালটি ছিল কল্লোলিত ও স্বর্ণপ্রসূ। প্রথমে ছোট, স্বল্পায়ু ও সম্ভাবনাময় বেশ কিছু সংকলন প্রকাশিত হয়। অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে স্বাক্ষর, সপ্তক, কালবেলা, ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিন। অপেক্ষাকৃত সংগঠিত উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে পূর্বমেঘ, উত্তরণ, পরিক্রম, উত্তর-অন্বেষা, ইত্যাদি সুপ্রতিষ্ঠিত পত্রিকা। আর সর্বোপরি সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত মাসিক সমকাল সেসময় সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রায় অনতিক্রম্য উৎকর্ষ ও মর্যাদার আসনটি করায়ত্ত করে। বিশেষত চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের সকল প্রধান ও শক্তিমান লেখক জড়ো হয়েছিলেন রুচিস্নিগ্ধ ও আধুনিক এই মাসিক পত্রিকার উদার পৃষ্ঠায়।
এরকম সৃষ্টিমুখর সময়ে নতুন একটি পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিয়েছিল তার ব্যাখ্যা সম্পাদক নিজে বিভিন্ন সময় লিখেছেন। কখনো লিখেছেন কণ্ঠস্বর পত্রিকার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণাপত্রে, কখনো পরিশীলিত সম্পাদকীয় রচনায়। আবার বহু বছর পর ভালোবাসার সাম্পানের আনন্দ-অভিযাত্রার স্মৃতিকথা লিখেছেন বিস্তারিত পরিসরে।
নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সাহিত্য-যাত্রার প্রস্তুতি চলছিল কয়েক বছর ধরে। তারপর পত্রিকার প্রথম প্রকাশ ১৯৬৫ সালে। সামরিক শাসনের বুটের নিচে যে পত্রিকার জন্ম, তা শুরু থেকেই জ্বালিয়েছে অবক্ষয়ের মশাল। শুধু সেই স্থবির সময়ের ক্লেদ আর অবক্ষয়কে ধারণ করেই থেমে থাকেনি কণ্ঠস্বর। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, এবং তা থেকে সঞ্চারিত দেশপ্রেমের উন্মাদনা ও অনুপ্রেরণাও কণ্ঠস্বরের পৃষ্ঠাতে স্থান করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর নতুন দেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে ধারণ করার জন্য বিস্তীর্ণতর কলেবরে উন্মুখ হয়েছিল পত্রিকাটি। নবপর্যায়ের ত্রৈমাসিক পত্রিকাটিকে স্বাধীন দেশের নবীন লেখকগোষ্ঠী আন্তরিকভাবেই নিজেদের পত্রিকা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তবু এগারো বছরের এই যাত্রার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে মধ্য-সত্তর দশকের মর্মান্তিক ও অস্থির সময় পার হয়ে ১৯৭৬ সালে।
বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় ঘোষণাপত্র ছিল সমকালের তুলনায় স্বতন্ত্র, সুতীক্ষ্ণ ও উচ্চকণ্ঠ। এরকম দু’টি উদাহরণ:
১. যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত যন্ত্রণাকাতর, যারা অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী, যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত, যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাস্পৃষ্ট, ‘কণ্ঠস্বর’ তাদেরই পত্রিকা। প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধ্যাপক, পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, পবিত্র সাহিত্যিক ও গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায় অনাহূত। (কণ্ঠস্বর, প্রথম সংকলন, জানুয়ারি ১৯৬৫)
২. সাহিত্যকে যারা অনুভব করতে চান শততলে, শতপথে, বিঘ্নিত রাস্তায়; আঙ্গিকের জটিলাক্ষরে, চিন্তার বিচিত্র সরণিতে; কটু স্বাদে ও লোনা আঘ্রাণে; সততায়, শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে অভিভূতিতে ও পাপে; মহত্ত্বে, রিরংসায়, উৎকণ্ঠায় ও আলিঙ্গনে, ‘কণ্ঠস্বর’ সেসব পদপাতবিরল তরুণদের পত্রিকা। (কণ্ঠস্বর, দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি ১৯৬৭)
ষাট দশকের সাহিত্যধারাটির মূল চরিত্র-লক্ষণগুলো কণ্ঠস্বরের পৃষ্ঠাতেই সবচেয়ে বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছিল। এর মৌলিক চরিত্রের মধ্যে ছিল বিচ্ছিন্নতা ও অবক্ষয়ের আরাধনা, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের জাগরণের পাশাপাশি অনিকেত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, দ্রোহী অথচ আত্মমগ্ন দৃষ্টিভঙ্গি, কবিতার নতুন স্বর, প্রবন্ধের মননদীপ্র গদ্য আর সর্বোপরি নান্দনিক শুদ্ধতার অন্বেষণ।
প্রকাশনার অন্তিম পর্যায়ে পত্রিকার পাঠক ও অনুরাগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, প্রকাশনা-মানের উৎকর্ষ ও সম্পাদকীয় আভিজাত্য স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বাড়েনি অনাস্বাদিতপূর্ব নতুন ও বিতর্কযোগ্য রচনার সংখ্যা। লক্ষ্য করা যায়নি সম্পূর্ণ নতুন কিন্তু অসামান্য প্রতিভাবান, সম্পাদকের আরাধ্য সেইসব ‘পদপাতবিরল’ তরুণ লেখকের আগমনবার্তা। সুতরাং এ পর্যায়ে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধের অনিবার্য সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়ে রচিত হলো কন্ঠস্বর যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান।
এই কালপরিধিতে কী বিশেষ অবদান রেখেছে ‘কণ্ঠস্বর’? ষাট দশক ও প্রথম সত্তরের সাহিত্যের মূল প্রবণতাটিকে সবচেয়ে ব্যাপক ও সুচারুভাবে তুলে ধরেছিল এ-পত্রিকা। পরে কণ্ঠস্বর-অনুপ্রাণিত লিটল ম্যাগাজিনে প্রধানত পুষ্টিলাভ করেছে আমাদের কবিতা ও প্রবন্ধ। শ্রমসাধ্য, অনন্য গদ্যরীতি ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারার প্রবন্ধ-সাহিত্যকে মর্যাদার সঙ্গে আসন দিয়েছে এ পত্রিকা। অপ্রচলিত শব্দের উজ্জ্বল ব্যবহার, পরিচিত শব্দের নতুন প্রয়োগে চমকপ্রদ বিশেষণ, অভিনব ব্যঞ্জনা ও চিত্ররূপ তৈরি, সম্পূর্ণ নতুন বাক্যরীতি নির্মাণ, ব্যবহার-জীর্ণ শব্দ ও বাকভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পরিহার করে নিজস্ব ভাষা ও সজীব অভিব্যক্তি নির্মাণ। মূল্যবান সারবস্তুর সঙ্গে আঙ্গিক-নিরীক্ষার পরিশ্রমী সমন্বয়ে অর্জিত হয়েছে প্রবন্ধের ভাষার শিল্পসম্মত পরিশীলন।
১৯৭৫ সালে কণ্ঠস্বর পত্রিকার দশকপূর্তি উৎসব উপলক্ষে ফজল মাহমুদ ও ইফতেখারুল ইসলামের যৌথ সম্পাদনায় একটি ক্ষীণকায় স্মারক-সংকলন প্রকাশিত হয়। সেখানে আত্মপক্ষ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকা লেখেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার প্রতিটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।
...কণ্ঠস্বর মূলত লেখক-সৃষ্টির পত্রিকা। এ কারণেই কণ্ঠস্বর ‘স্থৈর্য ও সংযম’-এর নয়, নতুনত্ব এবং প্রতিভার; গৃহপালিত প্রাতিষ্ঠানিকতার নয়, প্রতিষ্ঠাহীন অনিকেতের; তারুণ্যের এবং ভুলের, শক্তির এবং অসহায়তার, সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাচার ও দুঃসাহসী মৌলিকতার, অগতানুগতিকতার, আপোষহীনতার, ব্যতিক্রমের। ... নান্দনিক পরিশীলনের পাশাপাশি প্রতিভার উজ্জ্বল স্বেচ্ছাচারকে, কণ্ঠস্বর আজ অব্দি, একইভাবে অন্বেষণ করে।
...আমাদের চারপাশে আজ এক নবজাগ্রত দেশ এবং জাতি উন্মুখভাবে তার মৌলিক ভিত্তি অন্বেষণ করছে। রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা শিক্ষার মতো জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে এই ভিত্তি অন্বেষণের কর্মঠ শ্রম সোচ্চার। এই জাতির আদিমতম প্রজন্ম হিসেবে আমাদেরও আজ আমাদের জাতীয় সাহিত্যের সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে যেতে হবে- আমাদের সাধনা, প্রতিভা, সততা এবং শ্রমের মূল্যে। আর এই সুদৃঢ় সুশৃঙ্খল চারিত্র্য ব্যক্তির যোগ্যতাই আমাদের আগামী সাহিত্যের নেতৃত্বে নিতে পারে শুধু। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, উত্তরপ্রজন্ম, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯)
সারাজীবন তিনি তার দূরাভিসারী জীবনস্বপ্ন দ্বারা চালিত হয়েছেন। আরও বড় সার্থকতার অন্বেষণ করেছেন অন্য স্বপ্নে, অন্য সংগঠনে, অনন্য ভূমিকায়। তার বই ভালোবাসার সাম্পানে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে দু’টি কল্লোলিত সৃষ্টিশীল দশকের প্রধান সাহিত্যিক প্রবণতা ও প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে প্রবাহিত বাংলা সাহিত্যের নানা স্রোতধারা যা মিলিত হয়েছিল কণ্ঠস্বর পত্রিকায়।
