কক্সবাজারে গ্যাস পাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এলেও আতঙ্ক কাটেনি। ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা মেনে ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসাবাড়িতে রান্নার চুলায় আগুন দেয়নি স্থানীয়রা। সরজমিন দেখা যায়- এলপিজি গ্যাস পাম্পটি কক্সবাজার শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের আদর্শগ্রামের টিঅ্যান্ডটি টাওয়ারের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। এই সড়ক দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দূরপাল্লার পরিবহনগুলো শহরে প্রবেশ করে।
গ্যাসপাম্পের চারদিকে রয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি। পশ্চিমে কলাতলী হোটেল- মোটেল জোন। পূর্বপাশে পুলিশ লাইনস, জেলা কারাগারসহ একাধিক আবাসিক ভবন। গ্যাসপাম্প থেকে ছড়ানো আগুন রাত ১১টার মধ্যে কলাতলী-আদর্শগ্রামসহ দুই কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে আশপাশের বাসিন্দারা এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। নারী-পুরুষ শিশুরা বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজার এলপিজি গ্যাস স্টেশনের ৩ পাশে রয়েছে অসংখ্য বসতি। রয়েছে পর্যটকবাহী গাড়ির গ্যারেজ। যে গ্যারেজটিতে পার্কিং-এ থাকা ৩০ টি ট্যুরিস্ট জিপ পুড়ে গেছে। একই সঙ্গে পাশের ৩টি ঘরও পুড়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এই গ্যারেজের পার্কিং এ পর্যটকবাহী ৪০টি জিপ ছিল। শুধুমাত্র ১০টি গাড়ি বের করতে পারলেও বাকি গাড়িগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুরো গ্যারেজ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। আগুনে ঘর পুড়ে যাওয়ার পর গৃহিণী গোলজার বেগম জানান, আগুন থেকে বাঁচতে সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারলেও শেষ সম্বল আসবাবপত্র, স্বর্ণ ও নগদ টাকা সবই পুড়ে গেছে।
তার ভাষ্যমতে, হঠাৎ করে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, যা বর্ণনাতীত। ঘটনার ভয়াবহতায় তিনি ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র ফেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। তিনি বলেন, বসতি তো শেষ। বসতির ভেতরে ৫ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ৩ লাখ টাকা পুড়ে গেছে। শুধুমাত্র জীবন নিয়ে এক কাপড়ে বের হতে পেরেছি। এদিকে প্রশাসনের নির্দেশনার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা বন্ধ রেখেছেন ঘরের রান্না-বান্না। তারা বলছেন, এখনো আতংক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদকর্মী শহিদুল ইমরান বলেন- তাদের বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ঘরের মালামালও সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখনো বসতিতে ঢুকতে পারেনি। রান্নাও হয়নি। রাতে অন্যত্রে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে সেহ্রি খেয়েছি। আতঙ্ক কাটছে না, কারণ ফায়ার সার্ভিস নির্দেশনা দিয়েছে আগুন না জ্বালাতে। কলাতলী আদর্শ গ্রাম সমাজ কমিটির নেতা সাদ্দাম হোসেন গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণের ভয়াবহতা নিয়ে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেন-মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আদর্শগ্রামের শত শত মানুষ আজ বেঁচে আছি। বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট আগে সতর্কবার্তা না এলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতো ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। এদিকে সকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ: মান্নান জানান, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ৭টি ইউনিট যৌথভাবে কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দগ্ধ ১৫ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণের পর তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। আর ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এর পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ফায়ার সার্ভিস কক্সবাজার স্টেশনের উপ সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, ১৪ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ট্যাংক ঘিরে এ আগুন। পাম্পটি চালু হয়েছে মাত্র ৩ দিন আগে। গ্যাস পাম্পে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা বা অনুমতি ছিল না। অনুমোদনহীন পাম্প চালু করায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্যাস পাম্পের মালিক রামুর এইচএম নুরুল আলম জানিয়েছেন- সব নিয়ম মেনে গ্যাস পাম্পটি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি বলেন, এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
