যেন হুবহু চার বছর আগের চিত্রনাট্যেরই পুনরাবৃত্তি। তবে এবার আরও নাটকীয় ও বড় পরিসরে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফাইনালের আগে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সমান ৫ গোল নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন লিওনেল মেসি আর কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেই ফাইনালে মেসি করেছিলেন জোড়া গোল, কিন্তু হ্যাটট্রিক করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নিয়েছিলেন এমবাপ্পেই। ২০২৬ বিশ্বকাপেও যেন একই নাটক মঞ্চস্থ হলো, শুধু সংখ্যাগুলো বদলে গেল। এবারো ফাইনালের আগে সমান ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সমান অবস্থানে ছিলেন এই দুই তারকা। কিন্তু ফাইনালের আগে হওয়া তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ১০ গোলের মাইলফলকে পৌঁছে যান এমবাপ্পে। আর তাতেই সমীকরণ সহজ হয়ে যায়। গোল্ডেন বুট নিজের করে নিতে ফাইনালে মেসির প্রয়োজন পড়ে হ্যাটট্রিকের।
কিন্তু স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারা সেই ফাইনালে গোলের দেখাই পাননি আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। শেষ পর্যন্ত ১০ গোল নিয়েই টানা দ্বিতীয় বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতে নেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কীর্তি এর আগে আর কারও ছিল না। দেশের জার্সি গায়ে এমবাপ্পে আগেই পেছনে ফেলেছেন ফ্রান্স ফুটবলের একঝাঁক কিংবদন্তিকে। জুস্ত ফঁতেন, মিশেল প্লাতিনি, জঁ-পিয়েরে পাপিন, থিয়েরি অঁরি, অলিভিয়ের জিরুদÑ প্রত্যেকেই এখন তার পেছনে। ফ্রান্সের জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনও অনেক আগেই দখলে নিয়েছেন তিনি। এবার বিশ্বকাপ মঞ্চেও একই ইতিহাস লিখলেন। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তকমা এখন এমবাপ্পের দখলে।
বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ ২২ গোল এখন এমবাপ্পের দখলে। ২১ গোল নিয়ে দুইয়ে নেমে গেলেন মেসি। অথচ ফাইনালে একটি গোল করলেই এমবাপ্পের সমান ২২ গোলে পৌঁছে যেতে পারতেন আর্জেন্টাইন তারকা। কিন্তু নিয়তি সহায় হয়নি ফাইনালে আর গোলের দেখা পাননি তিনি। এমবাপ্পের এই উত্থান চোখধাঁধানো। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে তরুণ এমবাপ্পে করেছিলেন ৪ গোল। ২০২২ কাতারে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮-এ, যা তাকে এনে দেয় প্রথম গোল্ডেন বুট। আর এবার একাই করলেন ১০ গোল। আগের দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে যার গোলসংখ্যা ছিল ১২টি। তিনি এবার এক আসরেই করলেন ১০ গোল। মিরোসøাভ ক্লোসার বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড আগেই ছিল আলোচনায়, এবার সেটিকেও বহু দূরে ফেলে দিলেন এমবাপ্পে। ভাঙলেন মেসির ২১ গোলের রেকর্ডও। মেসি ২১ গোল করতে খেলেছেন ৩৩ ম্যাচ, ফাইনালের পর যা দাঁড়িয়েছে ৩৪-এ। সেখানে এমবাপ্পে মাত্র ২২ ম্যাচেই করে ফেলেছেন ২২ গোল। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ম্যাচেই গড়ে একটি করে গোল।
গোল্ডেন বল রদ্রির
সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতেছেন স্পেনের অধিনায়ক ও মিডফিল্ডার রদ্রি। চোখধাঁধানো কোনো গোল নেই, ঝলমলে ড্রিবলিং নেই। স্পেনের আট ম্যাচের একটিতেও তার নামের পাশে নেই গোল বা অ্যাসিস্ট। তবু গোটা টুর্নামেন্টে স্পেনের প্রতিটি জয়ের সুতোটা বাঁধা ছিল তার পায়েই। সবচেয়ে বেশি পাস সম্পন্ন করা, সবচেয়ে বেশি দূরত্ব দৌড়ানো আর সবচেয়ে বেশি খেলায় জড়িয়ে থাকার নিরিখে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
গোল্ডেন গ্লাভ উনাই সিমন
সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস নেন স্পেনের উনাই সিমন। পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেন তিনি। সাতটি ক্লিন শিট রেখে গড়েন নতুন বিশ্বকাপ রেকর্ড। যা আগের রেকর্ডের চেয়ে দু’টি ক্লিন শিট বেশি। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের চার্লস দে কেতেলারই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পরাস্ত করতে পেরেছিলেন তাকে। এই পথচলায় টানা ৬৪৯ মিনিট নিজের জাল অক্ষত রেখে বিশ্বকাপের নতুন রেকর্ড গড়েন বিলবাওয়ের এই গোলরক্ষক। আর্সেনালের প্রিমিয়ার লীগজয়ী গোলরক্ষক ডেভিড রায়াকে পেছনে ফেলে স্পেনের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে সুযোগ পাওয়া ২৯ বছর বয়সী সিমন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের আস্থার প্রতিদান দিলেন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে। ক্যারিয়ারে তার মোট ৯টি বিশ্বকাপ ক্লিন শিট সিমনের। সাবেক ফরাসি গোলরক্ষক ফাবিয়েন বার্তেজ ও ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের যৌথ রেকর্ড (১০) থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে তিনি।
সেরা তরুণ খেলোয়াড় পাউ কুবারসি
মাত্র ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবারসি জিতেছেন এবারের বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে স্পেনের রক্ষণকে দুর্গে পরিণত করে রেখেছিলেন বার্সেলোনার এই তরুণ ডিফেন্ডার, এমনকি দলের পোস্টার-বয় লামিন ইয়ামালকেও ছাপিয়ে গেছেন পারফরম্যান্সে।
ফিফা ফেয়ার প্লে পুরস্কার নেদারল্যান্ডস
মাত্র তিনটি হলুদ কার্ড দেখে ফিফা ফেয়ার প্লে পুরস্কার জিতে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। এ নিয়ে অষ্টম বারের মতো এই পুরস্কার পেলো কোনো দল। গ্রুপ ‘এফ’-এ ফেভারিট হিসেবে নামলেও শেষ বত্রিশে মরক্কোর কাছে ৩-২ ব্যবধানে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিদায় নিতে হয় ডাচ্দের।
