গোল করার পর সোজা দৌড়ে গিয়ে কর্নার ফ্ল্যাগে সজোরে লাথি মারলেন ফেররান তোরেস। ছবি তোলার কারিগররা সেই দৃৃশ্য দেখে হকচকিয়ে ওঠেন। নিজেদের ক্যামেরা বাঁচাতে সরে যান। মুহূর্তের মধ্যে সতীর্থরা এসে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। বাইরে থেকে দেখলে এটা স্রেফ একটা উদ্যাপন। কিন্তু যারা জানেন এই গোলের পেছনের গল্প, তাদের কাছে এই মুহূর্তটা ছিল বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা এক নীরব যন্ত্রণার বিস্ফোরণ। কারণ ফেররান তোরেসের এই বিশ্বজয়ের গল্পটা শুধু একটা ফাইনালের গল্প নয়। এটা একজন মানুষের নিজের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসার গল্প।
বার্সেলোনায় পা রাখার দিনটা ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই স্বপ্নের ওজনটাই একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়ালো। ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল ট্রান্সফার ফি নিয়ে আসা এক তরুণকে ঘিরে প্রত্যাশার পাহাড় জমতে থাকলো কাতালান সমর্থকদের। কিন্তু মাঠে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না তোরেস। ফর্মহীনতা, একের পর এক সমালোচনা, স্প্যানিশ মিডিয়ার সমালোচনাÑ সবমিলিয়ে ধীরে ধীরে একাদশ থেকেই ছিটকে যান তোরেস। নিজের সেই সময়টা নিয়ে পরে এক সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছিলেন তোরেস। বলেছিলেন, তিনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন এক ‘তলহীন গহ্বরে’। যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ চোখে পড়ছিল না তার। এই একটা বাক্যেই বোধহয় ধরা পড়ে একজন তারকা ফুটবলারের আড়ালে থাকা মানুষটার প্রকৃত যন্ত্রণা। যে যন্ত্রণা গোলের হিসাব বা ম্যাচের ফলাফলে কখনো ধরা পড়ে না। তবে হাল ছেড়ে দেননি তোরেস। নিজের মানসিক অবস্থা সামলাতে তিনি শরণাপন্ন হন একজন প্রফেশনাল মনোবিদের। শুরু হয় ভেতর থেকে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার এক নীরব প্রক্রিয়া। জিমে কঠোর পরিশ্রম, মাঠে বাড়তি ঘাম ঝরানো আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণÑ নিজের মানসিকতা বদলে ফেলার এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই রূপান্তরের প্রতীক হিসেবেই তিনি বেছে নেন এক নতুন পরিচয়। ‘এল তিবুরন’ বা হাঙর। শুধু একটা ডাকনাম নয়, এটা ছিল নিজের প্রতি একটা অঙ্গীকার। মানসিকভাবে আর কখনো দুর্বল না হওয়ার, প্রতিটি লড়াইয়ে হিংস্র আর অপরাজেয় থাকার। যে মানুষটা একসময় আত্মবিশ্বাসের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিই যেন নতুন করে নিজেকে বানিয়ে তুললেন এক শিকারির মতো, যে হার মানতে জানে না।
মনের লড়াইয়ে জয়ের পর মাঠের চিত্রটাও বদলে যেতে থাকে দ্রুত। ২০২৪-২৫ মৌসুমে অবিশ্বাস্য ফর্মে ফিরে বার্সেলোনাকে লা লিগা, কোপা দেল রে আর স্প্যানিশ সুপার কাপÑ এই তিন শিরোপা এনে দেয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পরের মৌসুমে সেই ধারাবাহিকতা বাড়িয়ে ক্লাব ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ২১টি গোল করেন তোরেস। যে ছেলেটাকে নিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠতো, তিনিই তখন বার্সেলোনার আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসার নাম। জাতীয় দলের জার্সিতেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। ইউরো ২০২৪-এ স্পেনের শিরোপাজয়ী অভিযানে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু নিয়তি যেন তার জন্য আরও বড় কিছু সাজিয়ে রেখেছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে অবশ্য শুরুটা মোটেও স্বপ্নের মতো ছিল না তোরেসের জন্য। খাতা-কলমে স্ট্রাইকার হলেও ফাইনালের আগ পর্যন্ত তার গোলসংখ্যা ছিল শূন্য। পর্তুগাল ম্যাচে একটা অ্যাসিস্ট ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারেননি তিনি। আর কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় একাদশ থেকেও বাদ পড়তে হয়। তবে ফাইনালে নেমে যেন সব হিসাব বদলে দিলেন। ৬২ মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তোরেস। ততক্ষণে গোটা বিশ্বের চোখ ছিল ওইয়ারসাবালের ওপর, কিন্তু ভাগ্য যেন অপেক্ষা করছিল অন্য কারও জন্য। ১০৬ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে জাল কাঁপিয়ে দেন তোরেস। গোটা ম্যাচে ১১টা সেভ করা এমিলিয়ানো মার্টিনেজও সেই শট রুখতে পারেননি। এরপর আরও একটা গোল করেছিলেন তিনি, তবে অফসাইডের কারণে বাতিল হয় সেটি। সেই একটি গোলেই বদলে যায় সব ইতিহাস। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে স্পেন, আর গোলদাতা হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তোরেসের হাতে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে গোল করা পঞ্চম ফুটবলার হলেন তিনি। আর ২০১৪ সালে জার্মানির মারিও গোতজের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বদলি নেমে বিশ্বকাপ ফাইনালের জয়সূচক গোলটি করলেন তোরেসই। গোলের পর ফেররান তোরেসকে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, তা আসলে স্রেফ একটা ট্রফি জেতার আনন্দ ছিল না। ছিল বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা প্রশ্ন, সমালোচনা, আত্মসংশয়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিশোধের উদ্যাপন। যে মানুষটা একদিন নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন এক তলহীন গহ্বরে, সেই মানুষটাই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের গল্পটা নিজের হাতেই নতুন করে লিখলেন তিনি।
