আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বসেরার মুকুট। এ মুকুট পুনরুদ্ধারের পথে দাপট দেখিয়ে আলবিসেলেস্তেদের হারায় লা রোহারা। তাতে পরিসংখ্যানেও উজ্জ্বল স্পেন। এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে হওয়া রেকর্ডগুলো জেনে নেয়া যাক-
গোতজের পাশে লেখা হলো তোরেসের নাম
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে করা ফেরান তোরেসের গোলটি গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপ ফাইনালের তৃতীয় দেরিতে হওয়া জয়সূচক গোল। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়সূচক গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায় তিনি এখন জার্মানির ফুটবলার মারিও গোতজের পাশে নাম লিখিয়েছেন। ২০১৪ ফাইনালে ঠিক এভাবেই আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়েছিলেন গোতজে। ক্যারিয়ারে এটি তোরেসের তৃতীয় বিশ্বকাপ গোল এবং এবারের আসরে প্রথম। সবশেষ ২০২২ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন এই বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড।
অপরাজেয় স্পেন, ভাঙলো ইতালির রেকর্ড
এই জয়ে স্পেন পেয়েছে তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। ২০১০ সালের পর প্রথম। এর মধ্যদিয়ে একাধিক বিশ্বকাপ জেতা সপ্তম দল হিসেবে নাম লেখালো তারা। শুধু তাই নয়, ২০০৮-১০ সালের স্পেন আর ১৯৭২-৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানির পর তৃতীয় দল হিসেবে ইউরো চ্যাম্পিয়ন থাকা অবস্থায় বিশ্বকাপ জেতার কীর্তিও গড়লো লা রোহারা। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এখন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত স্পেন। যা পুরুষ জাতীয় দলের ইতিহাসে দীর্ঘতম অপরাজিত যাত্রা। এতদিন এই রেকর্ড ছিল ২০১৮-২১ সালের ইতালির দখলে। বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালেও স্পেনের সাফল্যের হার রীতিমতো ঈর্ষণীয়। সাতটি ফাইনালের ছয়টিতেই জিতেছে তারা। ইউরোপের মধ্যে শুধু জার্মানিই (৭টি) তাদের চেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছে।
রক্ষণে অভেদ্য দুর্গ গড়া স্পেন
আক্রমণেই শুধু নয়, রক্ষণেও এবারের বিশ্বকাপে এক কথায় অবিশ্বাস্য ছিল স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টে সাতটি ক্লিন শিট রেখে গড়েছে এক আসরে সর্বোচ্চ ক্লিন শিটের নতুন রেকর্ড। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের চার্লস দে কেতেলারের কাছে। কোনো চ্যাম্পিয়ন দলের এত কম গোল হজম করার নজির নিকট অতীতে তেমন নেই। ২০০৬ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ড একটি গোলও হজম করেনি ঠিকই, তবে তারা শেষ বত্রিশ থেকেই বিদায় নিয়েছিল গোলশূন্য ড্র করে। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন প্রতিপক্ষকে গোলের সুযোগ দিয়েছে মাত্র ২.৩ এক্সজি (এক্সপেক্টেড গোলস), অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে মাত্র ০.৩। ১৯৯৬ সালের পর কোনো দলের রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্সে এত ভালো সংখ্যা দেখা যায়নি।
ইয়ামালের বয়সের কীর্তি, তরুণদের রাজত্ব
মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপ জেতা চতুর্থ কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়দের তালিকায় যৌথভাবে জায়গা করে নিয়েছেন লামিন ইয়ামাল। তার ঠিক পরেই সপ্তম কনিষ্ঠতম হিসেবে আছেন পাউ কুবারসি। যার বয়স ১৯ বছর ১৭৮ দিন। ইয়ামাল আবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা তৃতীয় কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়। তার ওপরে আছেন শুধু ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের হয়ে খেলা পেলে (১৭ বছর ২৪৯ দিন) আর ১৯৮২ সালে ইতালির হয়ে খেলা জুসেপ্পে বেরগোমি (১৮ বছর ২০১ দিন)। ইউরো ও বিশ্বকাপÑ দুটোই জেতা প্রথম টিনএজার হিসেবেও ইতিহাসে নাম লেখালেন ইয়ামাল। আরেকদিকে ফাবিয়ান রুইজ হয়েছেন বিশ্বের মাত্র দশম খেলোয়াড়, যিনি একই মৌসুমে বিশ্বকাপ আর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগÑ দু’টি ফাইনালেই খেলে দু’টিতেই শিরোপা জিতেছেন। পাসিংয়েও নজর কেড়েছেন কুবারসি। ফাইনালে ১২১টি পাস সম্পন্ন করে গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপ ফাইনালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাস সম্পন্নকারীর তালিকায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। এই তালিকার শীর্ষে আছেন ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের দুঙ্গা। যার পাস ছিল ১৩০টি।
পুরস্কার মঞ্চেও স্পেনের আধিপত্য
ব্যক্তিগত পুরস্কারেও এবার স্পেনের জয়জয়কার। গোল্ডেন বল জিতে স্পেনের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন রদ্রি। সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে একই কীর্তি গড়েছেন পাউ কুবারসিও। আর গোল্ডেন গ্লাভস জিতে স্পেনের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এই পুরস্কার ঘরে তুলেছেন উনাই সিমন।
আর্জেন্টিনার আক্ষেপ আর লাল কার্ডের ইতিহাস
রানার্সআপ হয়ে থামা আর্জেন্টিনার জন্য এই ফলাফল যেন এক পরিচিত আক্ষেপেরই পুনরাবৃত্তি। সবশেষ চার আসরে ফাইনালে ওঠা চ্যাম্পিয়ন দলই পরের আসরে রানার্সআপ হয়েছে। ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনা, ১৯৯৮ সালে ব্রাজিল, ২০২২ সালে ফ্রান্স, আর এবার ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনা। সবশেষ চার ফাইনালের তিনটিতেই রানার্সআপ হয়েছে তারা। ২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ হারলো আর্জেন্টিনা। এতে ভেঙে গেছে ১৩ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রা। গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপ ফাইনালে লক্ষ্যে একটিও শট নিতে না পারা একমাত্র দল এখন আর্জেন্টিনা। আর তা-ও একবার নয়, তিনবার (১৯৯০, ২০১৪ ও ২০২৬)। বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ড দেখা ষষ্ঠ খেলোয়াড় হলেন এনজো ফার্নান্দেস। ২০১০ সালে স্পেনের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের জনি হাইতিঙ্গার পর এই প্রথম কেউ ফাইনালে লাল কার্ড দেখলেন।
বিরতির অদ্ভুত দীর্ঘসূত্রতা
ফাইনালে প্রথমার্ধ শেষ হওয়া আর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মধ্যে বিরতি ছিল ২৭ মিনিট ২৪ সেকেন্ড। যা রীতিমতো ব্যতিক্রমী দীর্ঘ এক বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে।
