বার্লিনের পর এবার নিউ জার্সি- ইউরোপ সেরার মুকুট পরার দুই বছরের মাথায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সোনালি ট্রফিও নিজেদের করে নিলো স্পেন। রোববার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব ফুটবলের রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আরেকবার বিশ্বজয়ের উল্লাসে মাতে লা রোহারা। ২০১০ সালে ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ের যে মহাকাব্যিক ডাবল তারা পূর্ণ করেছিল, ২০২৬ সালে এসে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল সেই সোনালি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালো।
তবে এই সাফল্য কেবল পুরুষদের সিনিয়র দলেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবল ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে স্পেন এখন একইসঙ্গে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। ২০২৩ সালে সিডনিতে নারীদের বিশ্বজয়ের পর ছেলেরা এবার বৃত্তটি সম্পূর্ণ করলো। গত পাঁচ বছরে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত পুরুষ ও নারী ফুটবল মিলিয়ে অবিশ্বাস্য ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান শিরোপা জিতেছে স্পেন।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগ বিবিসি স্পোর্টসকে বলেন, ‘এটি কেবল সাধারণ আধিপত্য নয়, এটি যেন একটি নিখুঁত ঝড়। সাংস্কৃতিকভাবে আমরা কাজগুলো একটি নির্দিষ্ট উপায়ে করি এবং সবাই তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা জয়ের পরও থামছি না।’
এনরিকে বিদায় নেয়ার পর যখন দে লা ফুয়েন্তেকে প্রধান কোচ করা হয়, তখন অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে বড় ঝুঁকি বলে মনে করেন। কারণ বড় কোনো ক্লাব কোচিং করানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা তার ছিল না। তবে স্পেনের বয়সভিত্তিক ও একাডেমি দলগুলোর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সাবেক স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বলেন, ‘দে লা ফুয়েন্তে এই খেলোয়াড়দের বেশির ভাগকেই একাডেমি পর্যায় থেকে চেনেন এবং তারা একসঙ্গে একটি দল হিসেবে বড় হয়ে উঠেছে। এটি কেবল বর্তমানের দল নয়, এটি ভবিষ্যতেরও দল।’
৬৫ বছর বয়সী এই কোচ দলে নিয়ে এসেছেন ধৈর্য, কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। সব ধরনের প্রতিযোগিতায় টানা ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকার ঐতিহাসিক বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে তার দল। ফাইনালে জয়ের পর দে লা ফুয়েন্তে জানান, দলের তরুণরা তাকে জিজ্ঞেস করেছেÑ সব জেতার পর এখন আর কী জেতার বাকি আছে? তার উত্তর ছিলÑ সেপ্টেম্বর মাসের পরবর্তী ম্যাচটি জেতাই এখন একমাত্র লক্ষ্য, কারণ এই দলটা কখনোই তৃপ্ত হতে জানে না।
স্পেনকে প্রশংসার মালা পরিয়ে ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অরি ফক্স স্পোর্টসকে বলেন, ‘আমি স্পেনের এই পুরো সিস্টেমকে কৃতিত্ব দিতে চাই। কারণ স্পেন আগে এভাবে কখনো জিততো না। আর এখন তারা প্রতিটি স্তরেই জিতছে।’
একইসঙ্গে স্পেনের নারী ফুটবলের জাগরণও এই সাম্রাজ্য বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। সাবেক বার্সেলোনা খেলোয়াড় ও বর্তমান সাংবাদিক মারিয়া গারিদোর মতে, ১০ বছর আগেও মেয়েদের জন্য ‘লা মাসিয়া’র মতো কোনো একাডেমি ছিল না, যাতায়াত খরচ পর্যন্ত নিজেদের দিতে হতো। তবে গত পাঁচ বছরে উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও ডেডিকেটেড একাডেমি তৈরির ফলে পুরো চিত্র বদলে গেছে।
স্পেনের এই জয়রথ থামার কোনো লক্ষণ খুব একটা নেই। লামিন ইয়ামাল এবং পাউ কুবারসির মতো দুই ১৯ বছর বয়সী তরুণ ফুটবলার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। পেলে ও বেরগোমির পর ইয়ামাল ইতিহাসের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেললেন।
সবমিলিয়ে, তৃণমূল থেকে গড়ে তোলা একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন আর পদ্ধতিগত কাঠামোর ওপর ভর করেই আজ বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত পরাশক্তি হয়ে উঠেছে স্পেন।
