‘হামরা ত্রাণ চাইনা বাহে, ভালো করে বাঁইচপার চাই’Ñ চর বিদ্যানন্দের মানুষের আর্তনাদ। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি দুর্গম চর হলো চর বিদ্যানন্দ। এটি উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তিস্তা নদী তীরবর্তী একটি চর। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা অন্যান্য এলাকার মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পান না। নদীবেষ্টিত এই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় কেউ তাদের নিয়মিত খোঁজ রাখে না। উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে নদীর পাড় ধস ও ক্ষয়ের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে এই চরের প্রায় ৬০০০ মানুষ। গত দুই সপ্তাহে পশ্চিম চর বিদ্যানন্দ এলাকায় অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি নদীতে ভেসে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে মণ্ডলপাড়া জামে মসজিদ ও পূর্ব-চর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এতে নদীতীরবর্তী শত শত মানুষ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। চোখের পলকেই ঘরবাড়ি ও শত শত বিঘা আবাদি জমি গিলে খাচ্ছে নদী। ভাঙনের তাণ্ডব এতটাই তীব্র যে, কয়েকদিনের ব্যবধানে নদী থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরের একটি বাড়ির ঘরের কিনারায় এসে পৌঁছেছে তিস্তার গর্জন। ঘরবাড়ি রক্ষার সংগ্রাম এখন তাদের নিত্যদিনের লড়াই। তবুও চর ছেড়ে যেতে চান না তারা। ভাঙনহীন চরে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তারা। পরিপাটি কাউকে দেখলেই মনে করেন, হয়তো কোনো সরকারি কর্মকর্তা এসেছেন তাদের খোঁজ নিতে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে নিজেদের দুর্দশার কথা জানান। দেখান, সাম্প্রতিক সময়ে নদী ক্ষয় কতদূর এগিয়েছে। খোঁজ নেন জিওব্যাগ ফেলার কাজেরও। ভাঙনকবলিত পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত করতেও আগ্রহ দেখান।
এমন দৃশ্যই দেখা গেছে চর বিদ্যানন্দে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি হারিয়ে শোক সহ্য করতে না পেরে মারা গেছেন ৬০ বছর বয়সী আব্দুল কাদের ও ৭০ বছরের সালাম মিয়া। বাড়ি ভাঙার শোক সইতে না পেরে তিনদিন কারও সঙ্গে কথা বলেননি আব্দুল কাদের। এরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি জানান- প্রতিবেশী মেহের আলী। নদী ক্ষয়ে সব হারিয়ে সালাম মিয়া অন্যের জায়গায় ঘর তুলেছিলেন। কয়েকদিন পর আবারও পাড় ধস শুরু হলে সবার সঙ্গে নদীর তীরে পরিস্থিতি দেখতে যান তিনি। তীব্র ভাঙনের দৃশ্য দেখে সেখানেই তার মৃত্যু হয়Ñ এমনটাই জানান তার প্রতিবেশী গনি মুন্সী ও ভাগিনা বাদশা মিয়া। এদিকে, নদীর ক্ষয়ে ২৫টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে একটি পয়েন্টে ৫৫২টি জিওব্যাগ ফেলেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সেগুলোর বেশির ভাগই নদীতে তলিয়ে গেছে।
এমনটাই দাবি করেন মাইদুল ইসলাম (৩৪)। নদী তীরবর্তী এক বাসিন্দা শরিফুল ইসলামের ভাষ্য, ২৫টা বাড়ি নদী গিলে খেলো, আমাদের কান্না থামছে না। চরের মানুষের খবর কেউ রাখে না’। সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তারা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। একই এলাকার ছবুর আলী (৬৫) বলেন, আমার বাড়ি ১৭ বার নদীতে ভেঙে গেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তাইজুল ইসলাম বলেন, ভাঙন ও বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় শুকনো খাবার এবং সাত টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসান জানান, পশ্চিম চর বিদ্যানন্দের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে তিন হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই চর মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা এলাকাবাসীর।
