ম্যাচের স্কোর কার্ডে হয়তো গোলদাতার নাম মিকেল ওইয়ারজাবাল আর পেদ্রো পোরো। তবে ডালাস স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেয়ার নেপথ্যে আসল কারিগর ছিলেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। ফরাসিদের বিপক্ষে ম্যাচে তিনি একাই যেন হয়ে উঠেছিলেন স্পেনের রক্ষাকর্তা এবং আক্রমণের মূল সূত্রধর। কিলিয়ান এমবাপ্পের একের পর এক আক্রমণকে মাঝমাঠেই ভেস্তে দিয়ে স্পেনকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার মূল নায়ক রদ্রিই।
এক সময় ম্যানচেস্টার সিটির গুরু পেপ গার্দিওলা রদ্রিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তুমি বড্ড বেশি নড়াচড়া করছো। হোল্ডিং মিডফিল্ডারের কাজ হলো নিজের জায়গায় স্থির থাকা। নড়বে না, ওখানেই থাকবে।’ কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালের রাতে গার্দিওলার সেই চিরন্তন পরামর্শ যেন ডালাসের বাতাসে উড়িয়ে দিলেন রদ্রি।’
মাঠজুড়ে সবুজ কালির মতো ছড়িয়ে ছিল তার বিচরণ। ফরাসি বক্স থেকে শুরু করে নিজের গোলকিপার উনাই সিমোনের নাকের ডগা পর্যন্ত- কোথায় ছিলেন না রদ্রি? কোনো দূরপাল্লার বুলেট গতির শট কিংবা দর্শনীয় হেডার ছাড়াই তিনি দেখালেন কীভাবে একা একটা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তার এই অল-অ্যাকশন রূপ নিয়ে ম্যান সিটিতে তার সেই সাবেক গুরু গার্দিওলা অতীতে বলেছিলেন, ‘শুধু তার উপস্থিতিটাই অন্যরকম। সে বল স্পর্শ না করলেও বাকি ১০ জন খেলোয়াড় মাঠে নিরাপদ বোধ করে, তারা আরও ভালো খেলে। পরিস্থিতি যখন খারাপের দিকে যায়, তখন রদ্রির চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখার মতো।’
ফ্রান্সের বিপক্ষে রদ্রির পরিসংখ্যানও তার আধিপত্যের প্রমাণ দেয়। ৮৭ শতাংশ নিখুঁত পাসিং, ১৫ বার বল নিয়ে ওপরে ওঠা, শতভাগ সফল এরিয়াল ডুয়েল, ৪টি ট্যাকল এবং ২টি করে ক্লিয়ারেন্স ও রিকভারি। পুরো বিশ্বকাপে তিনি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দূরত্ব (৮৩.৪৭ কিলোমিটার) অতিক্রম করেছেন এবং ৬২৯টি সফল পাস দিয়েছেন।
রদ্রি এমন একজন খেলোয়াড় যিনি একা লাইমলাইটে আসতে চান না। মাঠের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কোনো পদচারণা নেই, সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি চালিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটা। ছেলেবেলায় যখন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের স্কাউটরা তাকে দলে নেয়, তখন সবাই ভেবেছিল সে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হওয়ার জন্য বড্ড রোগা আর খাটো। কিন্তু সেই রদ্রিই আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মগজ।
রদ্রির ফুটবলীয় দর্শনের মূল অনুপ্রেরণা কিন্তু বার্সেলোনার কিংবদন্তি সার্জিও বুসকেটস। তবে বুসকেটসকে আইডল মানলেও, রদ্রি আধুনিক ফুটবলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকাকে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শারীরিক শক্তি, নিখুঁত ট্যাকলিং আর আক্রমণভাগের সাথে মাঝমাঠের সেতুবন্ধন তৈরিতে তিনি অনন্য। স্পেনের এই মাস্টারমাইন্ডকে নিয়ে সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিচি মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, ‘রদ্রি এমন একজন ফুটবলার, যে মাঠে থাকলে পুরো দলের খেলার গতি বদলে যায়। সে শুধু নিজে ভালো খেলে না, বরং তার পজিশনিং আর পাসিং সেন্স দিয়ে চারপাশে থাকা অন্য ১০ জন খেলোয়াড়কেও সেরাটা দিতে বাধ্য করে। ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের এই জয়ে রদ্রিই ছিলেন আসল চালিকাশক্তি।’
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন যেন ২০১০ সালের সেই সোনালী যুগের স্পিরিট ফিরে পেয়েছে। ফরাসিদের উড়িয়ে ফাইনালে ওঠার পর স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘আমরা ২০১০ সালের সেই স্পিরিট আবার ফিরিয়ে এনেছি। এই দলের চরিত্রই আলাদা, যারা আজ খেলার সুযোগ পায়নি তারাও ম্যাচ শেষে অনুশীলনে ঘাম ঝরিয়েছে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং আমরা এই মুহূর্তটিতে সেরা ফর্মে পৌঁছানোর জন্যই সবকিছু পরিকল্পনা করেছিলাম।’
বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সকে যেভাবে স্পেন কোণঠাসা করেছে, তা দেখে মুগ্ধ ফুটবল বিশ্ব। সাবেক প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন রয় কিন ম্যাচ শেষে আইটিভিতে স্পেনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘ফ্রান্স কোনো দল হিসেবে খেলতে পারেনি। তারা ছিল কিছু দুর্দান্ত ব্যক্তিগত খেলোয়াড়ের সমষ্টি, যারা দলগতভাবে ব্যর্থ। অন্যদিকে স্পেন ছিল এককথায় অসাধারণ- তাদের খেলা দেখাটা চোখের শান্তি।’
আরেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগ বলেন, ‘আমরা যা দেখলাম তা হলো একটা দুর্দান্ত দলগত পারফরম্যান্স। সবকিছুর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফুটবলের প্রতিটি স্কুলেই এই ম্যাচটি দেখানো উচিত।’
