গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি সদর এবং দীঘিনালাসহ বিভিন্ন উপজেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি গত শনিবার সকাল থেকে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। সোমবার প্লাবিত এলাকাগুলো থেকে পানি সম্পূর্ণ নেমে যাওয়ায় চারদিন পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠছে খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ জনপদের ক্ষতচিহ্ন। ঘরবাড়ি থেকে পানি সরলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি; বরং ঘরে ফেরা মানুষের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র সুপেয় পানির অভাব, কাদা-মাটি পরিষ্কার এবং ঘরবাড়ি মেরামত। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে শনিবার বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন খাগড়াছড়ির বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও ফসলি জমির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সব সরকারি সহায়তা দেয়া হবে। পরিদর্শনে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, এবারের বন্যায় দীঘিনালার মেরুং, কবাখালী এবং খাগড়াছড়ি সদরের গঞ্জপাড়া, মুসলিম পাড়া ও মহিলা কলেজ এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। যার মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেন। শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, বিজিবি ও সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা খাদ্য ও সহায়তা বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন। তবে বাড়ি ফিরে চরম বিপাকে পড়েছেন দুর্গতরা। মেরুং এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল আলী বলেন, শনিবার সকাল থেকে ঘরের পানি পুরোপুরি নেমে গেছে। কিন্তু পুরো ঘর এখন থৈ থৈ কাদায় ভরা। টিউবওয়েলগুলো বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় এক ফোঁটা খাওয়ার পানি পাচ্ছি না। এখন আমাদের চাল-ডালের চেয়ে ঘর পরিষ্কার, সুপেয় পানি আর ঘর মেরামতের সাহায্য বেশি দরকার। কৃষি ও মৎস্য খাতেও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ১ হাজার হেক্টর জমির আমনের বীজতলা, আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত বিনষ্ট হয়েছে। ভেসে গেছে অর্ধশতাধিক পুকুরের মাছ। কবাখালী এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, শনিবার পানি নেমে যাওয়ার পর দেখছি আমার দুই কানি জমির বীজতলা পচে শেষ। পুকুরের লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। সরকারি প্রণোদনা না পেলে এবার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবো না। এদিকে জেলার সড়কগুলো থেকে পানি নেমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের একটি অংশ দেবে যাওয়ায় ভারী যান চলাচল কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, শনিবার সকাল থেকে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আমরা এখন দ্রুত পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মনোযোগ দিয়েছি। মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। দুর্গত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করছে এবং পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রান্তিক কৃষক ও মৎস্যচাষীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে দ্রুতই বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে।
