ফাইনালের টিকিট কার হাতে

এমবাপ্পে-ইয়ামাল মুখোমুখি

ফাইনালের টিকিট কার হাতে

ফন্ট সাইজ:

বাইরে তীব্র দাবদাহ। ভেতরে ফুটবলীয় উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছে ডালাস এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়াম। যেখানে ফরাসি বিপ্লব বনাম স্প্যানিশ আর্মাডা লড়াই। বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছেন এক ব্লকবাস্টার ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল। মুখোমুখি হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি ফ্রান্স এবং স্পেন। এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। প্রতিশোধ, পুনরুত্থান আর ট্যাকটিক্যাল মাস্টারমাইন্ডের বুদ্ধি এবং কৌশলের লড়াই। একদিকে, দিদিয়ের দেশমের ক্ষুরধার মস্তিষ্কশানিত এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশি আক্রমণভাগ। অন্যদিকে, লুইস দে লা ফুয়েন্তের তারুণ্যদীপ্ত ও আক্রমণাত্মক স্প্যানিশ আর্মাডা। ফুটবল বিশ্ব এক শ্বাসরুদ্ধকর মহারণের জন্য প্রস্তুত। অনেকটা নাটকীয় ভাবে সেমি-ফাইনালে পৌঁছেছে দল দুটো। ফ্রান্স এবারের গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচেই সেনেগালের বিপক্ষে শুরুতে কিছুটা ছন্দহীন ছিল।

কিন্তু বিরতির পর দেশমের জাদুকরী কৌশল পরিবর্তন খেলায় ফিরিয়ে আনে ফ্রান্সকে। মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল তরুণ উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলার দুর্দান্ত চিপ শটে ৩-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন তারা। এরপর থেকে ফরাসিরা অপ্রতিরোধ্য। ছয় ম্যাচে সর্বমোট গোল করেছে ১৬টি। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে চারটিতে ক্লিনশিট জয় নিয়েছে। গড়েছে এক অনন্য ডিফেন্সিভ রেকর্ড। স্পেন টুর্নামেন্টে পা রেখেছিল কাপ বিজয়ের প্রবল দাবিদার হিসেবে। যদিও গ্রুপ পর্বের শুরুতে নবাগত কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে ফুটবল ভক্তদের হতাশায় ডুবিয়েছিল। এরপর দলটি ঘুরে দাঁড়ায় সবচেয়ে কম গোল হজম করে। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত কোনো গোল না খেয়ে অন্য এক বার্তা দেয় ফুটবল বিশ্বকে।

কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে তাদের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে প্রথম ফাটল ধরে। ৩০ মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের গোলে স্পেন এগিয়ে যায়। ৪১ মিনিটে বেলজিয়ামের চার্লস ডি ক্যাটেলারের গোলে সমতা আসে। ১-১ গোলে সমতায় থাকা সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৮৮ মিনিটে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো। বেলজিয়াম হেরে যায় ২-১ গোলে। নিশ্চিত হয় সেমিফাইনাল। বিশ্ব কী দেখবে। ট্যাকটিক্সের চরম বৈপরীত্য! আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সফল ও বাস্তববাদী ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম। তিনি ইতিমধ্যেই দলের ডিফেন্সিভ স্ট্রাকচার ঠিক রেখে মাঝখানে মাইকেল ওলিসেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এনেছেন। এতে যোগ হয়েছে নতুন এক মাত্রা। দেশম ৪-২-৩-১ ফরমেশনেও এনেছেন পরিবর্তন। তিনি আসলে ওলিসে, উইঙ্গার উসমান দেম্বেলে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার গতিকে কাজে লাগিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকই বেশি পছন্দ করেন। এতসবের মধ্যেও ফরাসি শিবিরে দুশ্চিন্তা রয়েছে মানু কোনকে নিয়ে। মানু কোন একজন গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্সিভ স্তম্ভ। তার কার্ড সমস্যা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ও রয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে করে মিডফিল্ডের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

তবে অরিলিয়ে চুয়ামিনির দলে ফেরার সম্ভাবনা ফরাসিদের বাড়তি শক্তি। স্প্যানিশরা কী করবেন। লামিন ইয়ামালের ওপরই কি নির্ভর করবেন। যদিও তাদের দলটি এখন টোটাল ফুটবল খেলার জন্য প্রস্তুত। কোচ ফুয়েন্তে অলস পাসিং ফুটবল থেকে দলকে বের করে এনে গতিময় করেছেন। পাশাপাশি দুই উইং-এ দ্রুত আক্রমণ শানানোর দিকেই তার নজর বেশি। ফরাসিদের বিপজ্জনক কাউন্টার অ্যাটাক মাঝমাঠেই নস্যাৎ করতে নতুন এক কৌশল এঁটেছেন। তাই মাঝমাঠের মূল দায়িত্ব দেবেন রদ্রি এবং পেদ্রির ওপর। আসলে ফ্রান্স-স্পেন লড়াইটা হচ্ছে দুই নক্ষত্রের লড়াই। কিলিয়ান এমবাপ্পে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি।

রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান সুপারস্টার ও অধিনায়ক। এই বিশ্বকাপে ৮ গোল করে তিনি শীর্ষ গোলদাতার তালিকায়। তার অতিমানবীয় গতি এবং উইং থেকে ভেতরে কেটে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে তিনি ওস্তাদ। এজন্য স্পেনের রক্ষণভাগের মাথাব্যথার কারণ এমবাপ্পে। স্প্যানিশ রাইট ব্যাক পেদ্রো কিংবা সেন্ট্রাল ডিফেন্সের কুবার্সি এবং আইমেরিক লাপোর্তেকে নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন কোচ। আর সেটা হচ্ছে এমবাপ্পেকে বোতলবন্দি করা। ওদিকে, বার্সেলোনার তারকা লামিন ইয়ামাল স্পেনের গোলশক্তির এক বিস্ময়বালক। টুর্নামেন্ট জুড়েই তিনি আলোচনায়।

প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে তছনছ করার অভাবনীয় শক্তি তার। ইয়ামালই ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন। এই দুই দলের লড়াইয়ের একটি রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রয়েছে। একদিকে প্রতিশোধের আগুন, অন্যদিকে ৯ গোলের সেই মহাকাব্য। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়- ফ্রান্স ও স্পেনের শত্রুতা বেশ পুরনো। দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাসে স্পেনের দিকেই পাল্লা ভারী। এই ম্যাচ ঘিরে তীব্র প্রতিশোধের আলামত দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের উয়েফার সেই সেমিফাইনালে নাটকীয় ঘটনা ঘটেছিল। মিউনিখ স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে বিদায় করে ফাইনালে উঠেছিল স্পেন। সবচেয়ে বড় চমকটি ছিল ২০২৫ সালের জুন মাসে। উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফানালে হয়েছিল এক মহাকাব্যিক লড়াই। ৯ গোলের সেই অবিশ্বাস্য এবং শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলারে ফ্রান্সকে ৫-৪ ব্যবধানে হারায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস, মিকেল মেরিনো, পেদ্রি এবং লামিন ইয়ামালের জোড়া গোলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় মাঠে। তাদের বিধ্বংসী আক্রমণের জবাবে কিলিয়ান এমবাপ্পে, রায়ান শেরকি এবং রান্ডাল কোলো মুয়ানিরা তীব্র লড়াই করেও পরাজয় মানতে হয় তাদের।

তাই ডালাসের মাঠে নামার আগে এমবাপ্পেদের মনে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। একসময় দুই দেশের সম্পর্কে অনেক টানাপড়েন ছিল। দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে চলা এই যুদ্ধ-বিগ্রহের অবসান ঘটে ১৬৫৯ সালে পিরেনিস চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে। এই চুক্তিতেই দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সীমান্ত নির্ধারিত হয়। ১৮ এবং ১৯ শতকে তাদের সম্পর্ক এক জটিল রূপ নেয়। একদিকে, সাধারণ বুরবোঁ রাজবংশের মৈত্রী।

অন্যদিকে, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের পেনিনসুলার যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ। এখন এই বৈরী ইতিহাস সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর ছত্রছায়ায় এক শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক জোটে পরিণত হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- ফ্রান্স এখন স্পেনের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। বৃহৎ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীও বটে। এখানে প্রতি বছর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়ে থাকে। এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের চুক্তির মাধ্যমে। এই ঐতিহাসিক ম্যাচের চাপ এবং উন্মাদনা প্যারিস থেকে মাদ্রিদ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সমর্থকরা আশা করছেন- এমবাপ্পের হাত ধরেই টানা তৃতীয় বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছাবে ফ্রান্স। মাদ্রিদের রাস্তায় রাস্তায় এখন ২০১০ সালের মতো আরেকটি বিশ্বজয়ের স্বপ্নে উন্মাদনায় মেতেছেন স্প্যানিশরা। ডালাসের এই ব্লকবাস্টার সেমিফাইনালের দিকেই সবার নজর। কারা জিতবে? কারা হাসবে নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেগা ফাইনালে। অপেক্ষা ইংল্যান্ড বনাম মেসির আর্জেন্টিনার মধ্যে কে বিজয়ী হবেন তার। কঠিন লড়াই। কেউ কেউ বলছেন অগ্নিপরীক্ষা। ফরাসিদের ১৬ গোলের বিধ্বংসী আক্রমণভাগ। নাকি স্প্যানিশ পাথুরে রক্ষণ? এর ফয়সালা হবে ডালাসের সবুজ গালিচায়। অপেক্ষায় থাকুন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন