হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ৩০ গ্রাম প্লাবিত, চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ৩০ গ্রাম প্লাবিত, চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি

ফন্ট সাইজ:

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার এই সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলেছে, এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬ ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সাত জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮ পরিবার।

স্টাফ রিপোর্টার হবিগঞ্জ থেকে জানান, কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এতে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। এরপর পানির প্রবল চাপে প্লাবিত হতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। এ পর্যন্ত জেলার ৩৫টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পানিবন্দি মানুষ। এতে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন দুর্গত এলাকার মানুষ।

অন্যদিকে নতুন করে আরও কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। অবৈধ বালু উত্তোলনসহ সময়মতো মেরামতের অভাবে খোয়াই নদীর বাঁধের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার তেঘরিয়া ইউনিয়নের ভাদৈ ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ, বালুর বস্তা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। শুক্রবার এ ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ। পরে শনিবার আবারো পরিদর্শনে গিয়ে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি অনুদানের ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করেন তিনি।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বন্যার পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি উঠে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায়ও খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বন্যার পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। এতে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। শনিবার সকালে বানিয়াচংয়ের এ ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক আহমেদ আলী মুকিব। বাঁধ মেরামতের জন্য তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতা করেন।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৪৪৫ জন পানিবন্দি রয়েছেন। বন্যায় ২৮ হাজার ১৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন জিআর চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনা খাবার উপ-বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ লাখ টাকা ও ২০ টন চাল, বানিয়াচং উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ টন চাল এবং বাহুবল উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ টন চাল উপ-বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মুড়ি, চিড়া, আলু, ডাল, বিস্কুট ও মোমবাতির সমন্বয়ে ১ হাজার ৫২টি ত্রাণ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মজুতে রয়েছে ৩ লাখ টাকা, ৭০ টন জিআর চাল এবং ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো সংস্কার কিংবা প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের দাবি, আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।

বান্দরবান প্রতিনিধি জানান. টানা সাতদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সাত উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বান্দরবান-কেরানীহাট ও বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বান্দরবান সদরের আর্মি পাড়া, শেরেবাংলা নগর, ওয়াপদা ব্রিজ এলাকা, বনানী ’স-মিল, ইসলামপুর, ব্রিগেড এলাকা, ক্যাচিংঘাটা, মেম্বারপাড়া, হাফেজঘোনা, ফায়ার সার্ভিস এলাকাসহ সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় শহরের অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ছয় হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রিতদের জন্য খিঁচুড়ি ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এদিকে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পার্বত্যাঞ্চল। একদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বান্দরবান- রাঙ্গামাটি সড়কের ব্রিজঘাট এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে দুই জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে কাপ্তাই নদীর পানি রাজস্থলীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবেশ করায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল, রাজস্থলীসহ পার্বত্যাঞ্চলের অন্তত ছয়টি উপজেলায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ি ছড়া, নদী ও খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। প্রবল পানির চাপে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের ব্রিজঘাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সেতুর একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। ফলে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি রোগী পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প সড়ক না থাকায় দুই জেলার মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এদিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে কাপ্তাই নদীর পানি দ্রুত রাজস্থলী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়ে। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ৩০০টিরও বেশি বসতবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। অনেক গ্রাম এখনো পানিবন্দি রয়েছে। একজন খামারির প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মুরগি পানিতে মারা গেছে এবং দুই ব্যক্তির মোট সাতটি গরু ভেসে গেছে।

রাজস্থলীতে নয়টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২৮৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। তবে দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবার এখনো সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছে। দ্রুত নৌযান ও অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বাঘাইছড়ি উপজেলায়। প্রায় ৩০টি গ্রামের ২ হাজার ৩৬৬ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের জন্য ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বিলাইছড়িতে চারটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৮৩ জন এবং বরকলে তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫২ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে শুরু করলেও জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে। কোথাও পানি ধীরে ধীরে নামছে, আবার কোথাও নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে লোকালয়। ফলে লাখো মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, জেলার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ মানুষ এখনো পানিবন্দি। বন্যা, পাহাড় ধস, দেওয়াল ধস ও পানিতে ডুবে বিভিন্ন ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৭৬টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা। সাঙ্গু, শঙ্খ ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক নিম্নাঞ্চল এখনো জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর ভাঙন ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে সাতকানিয়া উপজেলায়। প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বড় অংশ এখনো পানির নিচে। উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পৌর এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলোতে এখনো পানি জমে আছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া এবং ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের কয়েকটি অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। লোহাগাড়ার সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও অনেক নিম্নাঞ্চল এখনো প্লাবিত। চন্দনাইশ উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। গ্রামীণ সড়ক, বসতভিটা, কৃষিজমি ও পুকুরের বড় অংশ এখনো পানির নিচে রয়েছে। বাঁশখালীর অন্তত আটটি ইউনিয়নের মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলোর পাশাপাশি নিজ বাড়িতে আটকে থাকা মানুষও শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। শুক্রবার রাতে নতুন করে বৃষ্টিপাত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় পানি আবার বেড়েছে। বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে শুক্রবার পৃথক ঘটনায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (৬) ও মিরাজ (৫) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আশিক দক্ষিণ ইলশা গ্রামের প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে এবং মিরাজ রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা। সকালে বাড়ির উঠানে খেলতে গিয়ে পাহাড়ি ঢলের স্রোতে তারা ভেসে যায়। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার আগেই তাদের মৃত্যু হয়। এই দুই শিশুসহ গত চারদিনে চট্টগ্রামে পাহাড় ধস, দেওয়াল ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ১০ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে দু’জন, বাঁশখালীতে তিনজন এবং সীতাকুণ্ড, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারা ও বোয়ালখালীতে একজন করে রয়েছেন। বন্যার পানিতে হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা ঘর ধসে পড়েছে। গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও ছোট ছোট সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়ির বন্যা পরিস্থিতির ধীর উন্নতি হতে শুরু করেছে। জেলা সদর ও দীঘিনালা উপজেলাসহ বিভিন্ন প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বন্যার রেখে যাওয়া ক্ষত। তবে পানি কমলেও পাহাড়ি এই জনপদের বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি বরং ঘরে ফেরা মানুষের সামনে এখন প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র সুপেয় পানির অভাব, কাদামাটি পরিষ্কার, বাসস্থান মেরামত ও পুনর্বাসন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে শনিবার বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন খাগড়াছড়ির বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেন, ‘আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, বিধ্বস্ত অবকাঠামো সংস্কার এবং ফসলি জমির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা দেয়া হবে।’ পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা, জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান, জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছারসহ জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন