আগের সরকারগুলো জানুয়ারিতে বই উৎসব করে এলেও বর্তমান সরকার ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দিতে চাইছে। জানুয়ারির লক্ষ্য থাকলেও আগে সময়মতো পাঠ্য বই দেয়ার নজির কম। কিছু বই পেতে বছরের প্রথম দুই-তিন মাস চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এই অবস্থায় সরকার নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে পাঠ্য বইসহ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। এজন্য বার্ষিক পরীক্ষার পরপরই পাঠ্যবই স্কুলে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় ৩০ কোটি পাঠ্যবই প্রস্তুতের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
গত সোমবার পাঠ্যবই ছাপানোর সমস্যা, অগ্রগতিসহ নানান বিষয় জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাকে ডেকে পাঠান তিনি। এরপরই শিক্ষামন্ত্রী প্রেস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে দেশের স্বনামধন্য পেপার মিলগুলোর সঙ্গে প্রিন্টারদের আনুষ্ঠানিক চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রী সময়মতো পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়ার তাগাদা দেন। কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেসব বিষয়ে জানতে চান। পাঠ্যবই ছাপানোর অগ্রগতি সম্পর্কে আমি প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিফ করি। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছেন- সেভাবে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে মোট ১৩৭টি বইয়ের মধ্যে ১৩৩টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইন শেষ হয়েছে। পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস এবং কর্মমুখী শিক্ষা- এই চারটি নতুন বইয়ের কাজও শুরু হয়েছে। যা আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে বই মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে এনসিটিবি। পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, আগামী ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সব শ্রেণির শতভাগ পরিমার্জিত বই পৌঁছে দেয়ার রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। মূল লক্ষ্য ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই যেন চার কোটি শিক্ষার্থী নতুন বই হাতে পায়। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৮৩ লাখ ১২ হাজার ৬৮০ কপি পাঠ্য পুস্তক মুদ্রণ করা হবে।
পাঠ্য পুস্তকে ইতিহাসের বিকৃতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব দূর করার বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা অত্যন্ত দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সাহসের জায়গা হলো বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী একটি নির্মোহ ও সত্য ইতিহাস চান, যেখানে আমাদের কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। অতীতে যার যতটুকু অবদান, তাকে ফুলে-ফাঁপিয়ে বা কাউকে খাটো করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, এবার তা থেকে আমরা সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসছি। এ ছাড়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা- যা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়েছিল, পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে এবার যথাযথভাবে ও সত্যনিষ্ঠভাবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
সোমবার শিক্ষামন্ত্রী পেপার মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই বই বিতরণের লক্ষ্যে তারা (পেপার মিল মালিকরা) সরকার ও মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন। প্রেস মালিক ও পেপার মিল মালিকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই অনেক সময় কাগজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তাই এবার উভয়পক্ষের মধ্যে লিখিত চুক্তি করা হবে। ওই চুক্তিতে কোন পেপার মিল থেকে কতো টন কাগজ, কী মানের এবং কতো গ্রামেজের কাগজ নেয়া হচ্ছে। কে কোথায় ত্রুটি করছেন, সেটি আমরা শনাক্ত করবো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এবার সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেয়া হবে। এ কাজে কেউ অনিয়ম বা গাফিলতি করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকবে। মন্ত্রী আরও জানান, শিগগিরই প্রেস মালিকদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করা হবে।
