বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ঝরলো ১১ প্রাণ

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ঝরলো ১১ প্রাণ

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে দেশ জুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। তবে এই উৎসবের আড়ালে বাড়ছে উদ্বেগজনক সহিংসতা। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, মারামারি, ছুরিকাঘাত, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে। কোথাও পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, কোথাও শোভাযাত্রায় দুর্ঘটনায়, আবার কোথাও অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজন সমর্থকদের সংঘর্ষে, তিনজন পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, একজন অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের সময় স্ট্রোকে, একজন শোভাযাত্রার সড়ক দুর্ঘটনায়, একজন গোলপোস্ট বা ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে এবং একজন কিশোরদের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাকে শুধু বিনোদনের উপকরণ হিসেবে না দেখে অতিরিক্ত আবেগতাড়িত হয়ে বিতর্কে জড়ানোর কারণে ঘটছে সহিংসতার ঘটনা। সংঘর্ষ এড়াতে সকলকে আবেগ থেকে বেরিয়ে এসে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

সর্বশেষ গত ৭ই জুলাই রাত ১১টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় মো. শরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে এক অটোচালক নিহত হন। নীলফামারী থেকে স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে কুমিল্লায় এসেছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তার পরিবার। খেলার শুরুতে মেসি পেনাল্টি মিস করলে শরিফুল উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। এ নিয়ে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন আর্জেন্টিনা সমর্থক শরিফুলকে মারধর করেন। হামলাকারীরা স্থানীয় দেখে শরিফুল একপর্যায়ে পাশের একটি মেসে চলে যান। তখন সেখানে গিয়েও তাকে মারধর করা হয়। এরপর দোকানের সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শরিফুল। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে গত ১লা জুলাই রাতে রাজধানীর আদাবরে নবোদয় হাউজিং এলাকায় ব্রাজিলের খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে আবুল বাশার বাদশা নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপি’র সভাপতি সাদ্দাম গুরুতর আহত হন। একই রাতে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় ফুটবল খেলা দেখার সময় চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে আলম আহমদ (২৮) নামে এক যুবক নিহত হন। এদিকে, ব্রাজিল-জাপান ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে আশুলিয়ায় নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার পর বালুচাপা দিয়ে রাখা হয়।

পতাকা টাঙাতে গিয়ে নিহত ৩: গত ১৯শে জুন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে মাহিন শেখ নামে এক স্কুলছাত্র মারা যান। ১৫ই জুন চট্টগ্রামে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে রামহরি বৈষ্ণবের মৃত্যু হয়। এর আগে গত ৯ই জুন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে ফয়সাল (১৮) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়।

আরও কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা: গত ৭ই জুলাই মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের পর অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের রসুল উদ্দীন (৪০) নামের এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়। তিনি মেসির একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত ৩রা জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় গোলপোস্ট ভেঙে মাহিদুল ইসলাম (২০) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। একই দিন নড়াইলে কিশোরদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে মোস্তফা কাজী নামে এক বৃদ্ধকে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৩ই জুন ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ব্রাজিল ফুটবল দলের সমর্থকদের শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মো. ইসমাইল (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।

এদিকে, গত ৭ই জুলাই রাতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ ঘিরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দু’জন আহত হন। গুরুতর আহত ব্রাজিল সমর্থক মাঈনুদ্দিন মিঠুকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, একই দিন রাতে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ম্যাচকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী প্রক্টরসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে একাডেমিক ভবনে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এদিন রাতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, দেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যেন আনন্দময় থাকে। এটিকে কেন্দ্র করে দেশে যেন আর কোনো প্রাণনাশের ঘটনা না ঘটে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ না নেয়। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, খেলা বিনোদনের অংশ, তাতে জয়-পরাজয় থাকবে- এটি মেনে নেয়ার মানসিকতায় ঘাটতি আছে আমাদের। তবে এটি শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রে নয়; জাতিগতভাবেই আমরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোনো ক্ষেত্রেই জয়-পরাজয় স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। এ কারণে এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন