সংকটের বছরেও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে 
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি দেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানি আয়কারী খাত তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২.৬৩ শতাংশ।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের জেরে গত বছরের এপ্রিল থেকে টালমাটাল হয়ে ওঠে রপ্তানি বাণিজ্য। চার দফায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শুল্ক হারে পরিবর্তন আনা হয়। এতে প্রধান বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এসব কিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯ বিলিয়ন বা ৯০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪.০৯ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) পণ্যের রপ্তানি আয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়েছে ২.৬৩ শতাংশ। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৭.৫৪ বিলিয়ন ডলার।

নারায়ণগঞ্জভিত্তিক প্যাসিফিক সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, গত বছরের ৯ই জুলাই ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের সময় রপ্তানি আদেশের ৬০ হাজার পিস টি-শার্টের উৎপাদন কাজ স্থগিত রাখার অনুরোধ করে একটি বড় মার্কিন ব্র্যান্ড। এরপর গত বছরের ১লা আগস্ট পরিবর্তিত ঘোষণায় পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামানোর পর কাজ শুরু করতে বলে ব্র্যান্ডটি। এভাবে ক্রেতারা ফিরতে শুরু করেন।
যু্‌ক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। ভিয়েতনামের কাছে আগেই প্রথম স্থান হারিয়েছে চীন।

জানা গেছে, গত বছরের ২রা এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘটনা দিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়, তখন মোট শুল্ক ভার দাঁড়ায় ৫২ শতাংশে। ওই হার কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা স্থগিত করা হয়। তিন মাসের এ শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে গত ৯ই জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের ওপর নতুন করে পাল্টা শুল্ক ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। গত ১লা আগস্ট থেকে এ হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় ১লা আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করে সরকার। এতে শুল্ক কমে ১৯ শতাংশ হওয়ার কথা। তবে গত ২০শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত বৈশ্বিক শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এর পরই বাংলাদেশসহ ১৫ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা-তা নিয়ে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেয় দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর। সে কার্যক্রম এখনো চলছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ইউরোপ, আমেরিকা ও নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেট মিলিয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। সে হিসাবে দুই বা আড়াই শতাংশ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এক্সটেনশন হবে কিনা, সেটি নিয়েও উদ্বেগ ছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অনিশ্চয়তাও ছিল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন ছিল। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকায় আমাদের পারফরম্যান্স ভালো হয়েছে। কারণ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমাদের ট্যারিফ পজিশন ভালো আছে। তবে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি। আগামী দিনে পোশাক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জ্বালানি সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, ব্যাংক খাতের সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন বিজিএমইএ সভাপতি।

এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে জুতা (ফুটওয়্যার) রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮৬.৮৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৩০৭ মিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি এসেছে প্লাস্টিক পণ্যে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্লাস্টিক রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৫২ মিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১৪ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৩১.৮৫ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ৯০.১৫ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া টেক্সটাইল সামগ্রী (পোশাক ছাড়া) রপ্তানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১৬৯ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১৪৯ মিলিয়ন ডলার। মাছ রপ্তানিতেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে মাছ রপ্তানিতে আয় দাঁড়িয়েছে ৩০.৬০ মিলিয়ন ডলারে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২৫.৭৫ মিলিয়ন ডলার। হেডগিয়ার অর্থাৎ টুপি ও মাথায় ব্যবহারের সামগ্রী রপ্তানি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে হয়েছে ২৩৬.৬২ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২৫৮.৭৪ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ওষুধ রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৮.৬৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১৮.৮৩ মিলিয়ন ডলার।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন