পুরো দেশে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। এখন পর্যন্ত ৫৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত রোগটি। প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা ও মশা বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ, ভাইরাস এবং মানুষ-এই তিন বিষয়ের সংযোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটায়। ডেঙ্গু নিয়ে আগাম সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বছর ঢাকার বাইরে প্রকোপ বেশি হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা বিভাগেও সমান তালে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সবচেয়ে কম আক্রান্ত সিলেট ও রংপুর বিভাগে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৮ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর ১লা জানুয়ারি থেকে ৯ই জুলাই পর্যন্ত ৭ হাজার ৮১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ২৪ জন। আর ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরেছেন ৭ হাজার ১৪২ জন। বর্তমানে সারা দেশে ৬৪৯ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ সময়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৯টিতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। যে ছয়টি জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি তার মধ্যে রয়েছে- ঢাকা বিভাগের শরীয়তপুর এবং রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা।
ঢাকা বিভাগ: সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী এবং মৃত্যু ঢাকা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে ৩৪ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭৫১ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া সর্বোচ্চ ১০ জন মারা গেছেন ঢাকা বিভাগেই। মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। অতীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে রাজধানীর দুই সিটিতে প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এবার কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি। তবে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনে কাজ করবে বলে জানা গেছে।
বরিশাল বিভাগ: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে ২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এ বিভাগে মৃত্যুর হার অনেকটা কম। এখন পর্যন্ত দু’জন রোগী ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। এই বিভাগের ছয় জেলাতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। গত বছর বরগুনা জেলায় ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু দেখা দিয়েছিল।
ময়মনসিংহ বিভাগ: মৃত্যুর দিক দিয়ে দ্বিতীয় ময়মনসিংহ বিভাগ। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে কেউ মারা যায়নি। এ সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন একজন। বর্তমানে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৩ জন। এখন পর্যন্ত এই বিভাগে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৪৬ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগ: গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ বিভাগে ১ হাজার ৪১১ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। মারা গেছেন ৩ জন। এদিকে, একটি জরিপে চট্টগ্রাম নগরের প্রতি চার বাড়ির একটিতে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ। এসব নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশা বা ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে। সমপ্রতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে জরিপের প্রতিবেদনে ৪ দফা জরুরি সুপারিশও দেয়া হয়েছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের ভিত্তিতে ঝুঁকির তিনটি আন্তর্জাতিক সূচকের সবক’টিতেই বেশি চট্টগ্রাম।
খুলনা বিভাগ: গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ১০ জন রোগী নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে একজন রোগী মারা গেছেন। এখন পর্যন্ত এ বিভাগে ৯৭৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ জন মারা গেছেন।
রাজশাহী বিভাগ: গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে নতুন করে কোনো ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হননি। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত ২৭৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন একজন।
রংপুর ও সিলেট বিভাগ: রংপুর ও সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত কেউ মারা যাননি। গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগে নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি হয়নি। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত ৩৪ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে তিনজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর সিলেট বিভাগে নতুন করে দু’জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ বিভাগে এখন পর্যন্ত ৭২ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেঙ্গুর বিস্তারের বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার মানবজমিনকে বলেন, এ বছর ঢাকায় তুলনামূলক ডেঙ্গুর প্রকোপ কম হবে। ঢাকার বাইরে প্রকোপ বেশি হবে। বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু ছড়াবে। ইতিমধ্যে এসব জায়গায় ডেঙ্গু রোগী ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরে ঘরে সচেতনতা ছাড়া উপায় নেই। মানুষকে সচেতন করতে হবে। নিজের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিয়মিত মশকনাশক ছিটাতে হবে।
