ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

মানবতাবিরোধী অপরাধ

ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড

ফন্ট সাইজ:

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মোট ৮টি অভিযোগের মধ্যে ৫টিতে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। পৃথক তিন অভিযোগে ১০ বছর করে সাজা হলেও তা যুগপৎ কার্যকর হওয়ায় তাকে মোট ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। একইসঙ্গে দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের অভিন্ন পরিকল্পনায় 
ইনু জেনেশুনে অংশ নিয়েছিলেন এবং উস্কানি, ষড়যন্ত্র ও সহায়তার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত ছিলেন।

তবে এ রায়ে অসন্তোষ জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ, যারা শাস্তি বৃদ্ধি ও খালাস পাওয়া অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ইনু রায়কে ‘প্রহসনের বিচার’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার পরিবারও এ রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ মামলার একমাত্র আসামি ইনু। তাকে গতকাল কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এদিন রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। এর মধ্যদিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।

কোন অপরাধে সাজা পেলেন ইনু: হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট ৮টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৩টি প্রমাণিত হয়েছে। তিনটি অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে সাজা দেয়া হয়। আর বাকি পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল। তিনটি অভিযোগে পৃথকভাবে সাজা দেয়া হলেও সব সাজা যুগপৎ কার্যকর হবে। ফলে আসামিকে মোট ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ১, ২, ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। অন্যদিকে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণকে যথেষ্ট বলে মনে করেন।

আদালতের মতে, আসামির কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী ষড়যন্ত্র, উস্কানি, সহায়তা ও প্ররোচনা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে অংশগ্রহণের আইনি উপাদান পূরণ করেছে। রায়ের কার্যকরী অংশে ট্রাইব্যুনাল ৩ নম্বর অভিযোগে ৬ জন ভুক্তভোগীসহ অন্যদের গুরুতর আহত করা, নির্যাতন, অত্যাচার এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের দায়ে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ৬ নম্বর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে ষড়যন্ত্র, উস্কানি ও সহায়তার দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া ৭ নম্বর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রের দায়ে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল যা বলেন: রায়ের শুরুতে ট্রাইব্যুনাল মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৫শে অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়া হয়। পরে ডিসচার্জ আবেদন খারিজ করে তার বিরুদ্ধে আটটি অভিযোগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষ ৯ জন সাক্ষীকে জেরা করে এবং নিজেদের পক্ষে দুইজন প্রতিরক্ষা সাক্ষী হাজির করে। এ বছর ২রা এপ্রিল থেকে ১৪ই মে পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ট্রাইব্যুনাল বলেন, মামলায় মৌখিক সাক্ষ্যের পাশাপাশি ভিডিও ক্লিপ, ডিজিটাল তথ্য, টেলিফোনে আড়িপাতা কথোপকথন, গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব ডিজিটাল আলামতের সত্যতা, সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং ফরেনসিক পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া আদালত বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। আদালতের মতে, এসব প্রমাণ আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং যথাযথ সাক্ষীর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এসব প্রমাণের সত্যতা নিয়ে আদালত সন্তুষ্ট।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামির দুটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব কথোপকথন থেকে প্রতীয়মান হয়, আসামি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। বরং ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কৌশলগত, সাংগঠনিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে সক্রিয়ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনের নেতাদের শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত, রাতে গ্রেপ্তার এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, অভিন্ন পরিকল্পনার প্রমাণ এবং উস্কানির প্রমাণ বিশ্লেষণে এসব প্রতীয়মান হয়েছে। ইনু তথ্য সংগ্রহ, বিপুলসংখ্যক সমর্থক মোতায়েন, দেশব্যাপী সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ এবং আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদ’, ‘উগ্রবাদ’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উপস্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের মতে, এসব বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণকে বৈধতা দেয়ার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল এবং তা উস্কানির পর্যায়ে পড়ে। রায়ে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপিত আড়িপাতা টেলিফোন কথোপকথন, সত্যতা যাচাইকৃত অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং, আসামির স্বেচ্ছায় দেয়া গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার, রাজনৈতিক জোটের বৈঠকের কার্যবিবরণী, অন্যান্য দলিল এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য একত্রে মূল্যায়ন করে ট্রাইব্যুনাল নিশ্চিত হয়েছেন যে, আসামি জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অবৈধ উপায়ে দমনের অভিন্ন পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ইনু কেবল একজন নিষ্ক্রিয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। তিনি সচেতনভাবে এমন একটি বয়ান প্রচার ও সমর্থন করেছেন, যেখানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি আন্দোলনের বিরুদ্ধে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন এবং প্রকাশ্য বক্তব্য, সাক্ষাৎকার ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ওই অভিন্ন অপরাধমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উৎসাহ ও সহায়তা করেছেন।

রায়ে অসন্তুষ্ট প্রসিকিউশন, ‘প্রহসনের বিচার’ বললেন ইনু: হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্ট নয় রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, রায়কে ‘প্রহসনের বিচার’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইনু ও তার পরিবার। গতকাল রায় ঘোষণার পর দুপুরে নিজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ মোটেও সন্তুষ্ট নয়। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে আটটি অভিযোগই প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তার দাবি, ১০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত এবং আসামির লিখিত সাফাই বক্তব্যের মাধ্যমে অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ইনুর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা। ওই বৈঠকে কারফিউ জারির মাধ্যমে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা এবং আন্দোলন দমনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি। জোটের শরিক দলের নেতা হিসেবে ইনুও সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক ফোনালাপে আন্দোলন দমনসংক্রান্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সমর্থন দেয়া এবং ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলার পরামর্শ দেয়ার অভিযোগও আদালতে উপস্থাপন করা হয় বলে জানান তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ইনুর স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য থাকার পরও অন্যান্য অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এটি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। ট্রাইব্যুনাল যে সাজা দিয়েছেন, তা অপ্রতুল এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে আমরা মনে করি। তিনি জানান, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর খালাস পাওয়া অভিযোগগুলোর বিষয়ে এবং শাস্তি বৃদ্ধি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করবে।

এদিকে রায় ঘোষণার পর এজলাস থেকে গারদে নেয়ার সময় হাসানুল হক ইনু বলেন, জিয়াউর রহমান সাজা দিয়েছিল। তার ছেলে তারেক রহমানও সাজা দিয়েছে। এটা প্রহসনের আদালতে ফরমায়েশি রায়। তিনি আরও বলেন, ‘প্রহসনের বিচারের সাজা দিলো, আমি বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেলাম। এ সময় প্রিজন ভ্যানে থাকা অন্য কয়েকজন আসামিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। অন্যদিকে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক রীনা এ রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইনুর বিরুদ্ধে দেয়া এই রায় প্রত্যাখ্যান করি, ঘৃণা করি। আমরা সংক্ষুব্ধ। আমরা আইনজীবী, পরিবার ও দলের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন