সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা

ফন্ট সাইজ:

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলনকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান মুদ্রানীতির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন। এ সময় চার ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এটি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের প্রথম মুদ্রানীতি। পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় ড. হাবিবুর রহমান বলেন, আগামী মুদ্রানীতিও ‘সংকোচনমূলক ধারা’ বজায় রাখা হবে। নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন না এনে ১০ শতাংশ বহাল থাকবে। একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য সুদহারের মধ্যে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট সাড়ে ১১ শতাংশ ও স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) আগের মতোই সাড়ে ৭ শতাংশ একই রাখা হয়েছে।

হাবিবুর রহমান বলেন, বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মূল্যস্ফীতিও অন্তত সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থার কারণে আগামীতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরদার হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। আগামী অর্থবছর শেষে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার আলোকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ হবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মাঝে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। যে কারণে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে গত মে মাসে ৯.৪২ শতাংশে উঠেছে; ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর যা সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি শিগগিরই কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। যে কারণে প্রধান নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছিল ৮.৫০ শতাংশ। যদিও গত এপ্রিল পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৪.৭৫ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানের এই প্রবৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে ঋণাত্মক। কেননা ঋণের সুদ যোগ হয়ে প্রবৃদ্ধির হিসাব হয়। বর্তমানে ঋণের গড় সুদহার রয়েছে ১১ শতাংশের ওপরে। এর আগে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ৭.২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয় ৬.১০ শতাংশ। সরকারি খাতের ঋণ চাহিদা বিবেচনায় জুন পর্যন্ত ২১.৬০ শতাংশ ধরা হলেও গত এপ্রিল পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ২২.১৬ শতাংশ। মূলত সরকারের কাঙ্ক্ষিত আয় না থাকায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি জারি করা হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে থাকা, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে-এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আমরা কিন্তু এখন আর পুনঃতফসিলীকরণ একেবারেই উৎসাহিত করছি না।’

গভর্নর আরও জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দু’টি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে- অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, যেন এই আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান- গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

গভর্নর আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টকে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে, যেকোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তি সর্বোচ্চ হবে। আগে হয়তো সর্বনিম্ন মাত্রার শাস্তি দেয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিই দেয়া হবে।’
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সময় চান গভর্নর: বেসরকারি শরীয়াহ্‌ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে চলমান অস্থিরতা নিরসনে পূর্ণাঙ্গ পরিচালক পর্ষদ দিতে আরেকটু সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি এখন ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা-টারার বাইরে চলে গেছে। একটু সময় দেন, ঠিক হয়ে যাবে।’
গভর্নর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকগুলোকে ১৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৫১ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়। আমরা দায়িত্ব নেয়ার প্রথম চার মাসে কোনো অর্থ দেয়া হয়নি। তবে ইসলামী ব্যাংকের সংকট তৈরির কারণে ১৩ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে জোগান দেয়া হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ডিজিটাল লেনদেন সমপ্রসারণে আন্তঃপরিচালনযোগ্য ?‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এর মাধ্যমে ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহজ ও নির্বিঘ্ন ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত হবে।

ছয় ব্যাংকের অস্বাভাবিক ঋণ গোপন: বেসরকারি ছয়টি ব্যাংকে গত ২৩, ২৪ ও ২৫শে জুন ছয়টি দল বিশেষ পরিদর্শন করেছে তথ্য তুলে ধরে গভর্নর বলেন, ‘এই ছয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে অডিট করা হয়। সেখানে খুবই অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে। অনেক ঋণের তথ্য গোপন করা হয়। খেলাপিতেও একই অবস্থা। এছাড়া আইটিও অডিট করা হয়।’

মেঘনা গ্রুপের বৈদেশিক মুদ্রার আয় সেভাবে না থাকলেও বিদেশি মুদ্রায় ৮ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্নে উঠলে গভর্নর বলেন, আমাদের রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলার পার করেছে। আরও বাড়বে। এখন আমরা স্থিতিশীল আছি।
সিটি গ্রুপের বড় ঋণ নিয়ে ২৯ ব্যাংক সমস্যায় আছে প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘তাদের ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ আছে ২৯ ব্যাংকে। কিছু সমাধান তৈরি করার চেষ্টা চলেছে। আমার মনে হয় আগামী তিন মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন