কিংমেকার আনচেলোত্তি

কিংমেকার আনচেলোত্তি

ফন্ট সাইজ:

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে তখন প্রায় ৭০ হাজার মানুষের চিৎকার আকাশ ছুঁয়েছে। ফুটবল মাঠে আক্ষরিক অর্থেই নেমে এসেছে এক মহাপ্রলয়। ডাগআউট থেকে ব্রাজিলের ফুটবলার, কোচিং স্টাফরা মাঠের ভেতর একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। কেউ কাঁদছেন, কেউ আবেগের চোটে দিশাহারা। কারণ, ঠিক ৯৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির ওই একটা গোল ব্রাজিলকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক লজ্জাজনক বিদায়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। জাপানের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয়টা ছিল সেলেসাওদের অস্তিত্বের লড়াই।

আর এই অবিশ্বাস্য মহাপ্রলয়ের মাঝে নোঙর ফেলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। একদম শান্ত, অবিচল, কোনো বিকার নেই। যেন চারপাশের এই সুনামি তাকে স্পর্শই করতে পারছে না। তিনি কার্লো আনচেলোত্তি। সবাই যখন উদ্‌যাপনে মত্ত, তিনি তখনো সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সহকারীদের দিকে ঘুরলেন। ডান হাতের ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন দানিলোকে।

কার্লোই যেন এই ব্রাজিলের এক ‘শান্তির মহাসমুদ্র’। অথচ ব্রাজিলের কোচের চাকরিটা পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে চাপের জায়গা। ২০১৪ সালে লুইজ ফেলিপে স্কোলারির দলটাকে আবেগের এমন এক চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, চাপের মুখে তারা যেন স্রেফ রাবারের মতো ছিঁড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আনচেলোত্তির ক্ষেত্রে সেটা অসম্ভব দেখা গেল। তার সহকারী ক্লিমেন্ট যেমনটা বলেছিলেন, ‘ব্রাজিল বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো তীব্র চাপের জায়গায় আপনার এমন একজন কোচ দরকার নেই, যিনি নিজেই নার্ভাস হয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দেবেন।’

কার্লোর সহজাত এই কুলনেস। তখন তিনি এভারটনের কোচ। টটেনহ্যামের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৫-৪ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ডকে দেখা যায় কাপের গরম চা ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে! জয়ের পর সেটাই মনে করিয়ে দিলেন মাগালায়েস, বললেন, ‘কোচ সবসময় আমাদের শান্ত থাকতে বলেন। বিরতির সময় একটাই কথা ছিল- মাথা ঠান্ডা রাখো।’

তবে আনচেলোত্তি মানেই স্রেফ ‘কুল ভাইব’ আর বড় ইগো সামলানোর মানুষ নন। তিনি একজন খাঁটি ট্যাকটিক্যাল জিনিয়াস। কাইশু সানোর ২৯ মিনিটের গোলে জাপান এগিয়ে যায়। তখন ব্রাজিলের সামনে ২০০২ সালের পর নকআউটে প্রথমে গোল খেয়ে না জেতার ভূত তাড়া করছিল। ৩৩৩টি পাস খেলেও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে মাঝমাঠে খেলানোর ছকটা জাপানের জমাট ডিফেন্সে মার খাচ্ছিল।

কিন্তু আনচেলোত্তি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট কৌশলের গোলাম নন। তিনি নিজেই বলেন, ‘দলের কেবল একটি নির্দিষ্ট আইডেন্টিটি থাকা মানে নিজের সামর্থ্যকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।’ বিরতিতে নিজের ভুল স্বীকার করে ভিনিকে পাঠালেন তার চেনা বাঁ-প্রান্তে। একইসঙ্গে লুকাস পাকেতার ইনজুরিতে মাঝমাঠ ফাঁকা করে এনড্রিককে নামিয়ে ছক করে ফেললেন ৪-২-৪! এই জুয়াটাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিলো। এনড্রিক জাপানের তিন সেন্ট্রাল ব্যাককে পিন করে ফেললেন, আর উইংয়ে শুরু হলো ব্রাজিলের আক্রমণ। এরপর সেই চিরচেনা এক বদলি রোমাঞ্চ। ৬৬ মিনিটে মাঠে আসা মার্টিনেল্লিই জয় ছিনিয়ে এনে দিলেন সেলেসাওদের।

এই দৃশ্য দেখে ফুটবল ভক্তদের মনে পড়তে বাধ্য রিয়াল মাদ্রিদের সেই অবিশ্বাস্য রাতগুলোর কথা। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ডাগআউটে বসে এই মানুষটাই তো কতোবার মড়ার উপর খাঁড়া করে বাঁচিয়েছেন লস ব্লাঙ্কোসদের। ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে রিয়াল যখন মৃত, তখন বেঞ্চ থেকে রদ্রিগোকে নামিয়ে শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে রূপকথা লিখেছিলেন তিনি। কিংবা ২০২৪-এ বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে হোসেলুর সেই ৪ মিনিটের ম্যাজিক! বার্নাব্যুর সেই ওল্ড ব্লুপ্রিন্টটাই যেন হিউস্টনে ফিরিয়ে আনলেন ডন কার্লো।

জাপানের দুর্বলতা ছিল বাতাসে। আনচেলোত্তির নির্দেশে দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো ক্রসের বন্যা। মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস যেমনটা বলছিলেন, ‘কোচ আমাদের বক্সে প্লেয়ার বাড়িয়ে ক্রস করতে বলেছিলেন।’ মার্টিনেল্লিকে উইং ছেড়ে বক্সে ইনসাইড ফরোয়ার্ড হিসেবে পুশ করার যে কৌশল আনচেলোত্তি দেখালেন তা অনবদ্য। ৯৬ মিনিটে সেই মার্টিনেল্লির পা থেকেই এলো জয়সূচক গোল। মার্টিনেল্লি নিজেই স্বীকার করলেন, ‘আর্সেনালে আমি এই পজিশনে খেলি না। কিন্তু কোচের নির্দেশ আমি যেকোনো জায়গায় খেলতে রাজি।’ এমনকি সাইডলাইনে তিনি নেইমারকেও ওয়ার্ম-আপে রেখেছিলেন এক চরম ট্রাম্প কার্ড হিসেবে। ম্যাচের পর বস বললেন, ‘আমি নেইমারকে বলেছিলাম একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোল না এলে ওকেই নামাবো।’

ম্যাচ শেষ। তখনো কার্লোর মুখে সেই চেনা বিনয়। ড্রেসিংরুমে যাওয়ার আগে জাপানের বিধ্বস্ত ফুটবলারদের বুকে টেনে সান্ত্বনা দিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসে একেই বললেন নিজের দেখা ব্রাজিলের ডাগআউটের সবচেয়ে ‘কমপ্লিট গেম’, ‘আপনাকে ভুগতে হবে, এটাই ফুটবলের অংশ। এতে নতুনত্ব কিছু নেই। যেমন কষ্ট আছে, তেমনি আছে স্বস্তিও।’

ইতালির সহকারী কোচ থেকে জুভেন্টাস, এসি মিলান, চেলসি, পিএসজি, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ডাগআউট সামলানো কার্লো এখন প্রথমবারের মতো কোনো জাতীয় দলের প্রধান। হিউস্টনের মাঠে পরের হাফের ফুটবল আসলে তার সেই অভিযোজন ক্ষমতারই এক জীবন্ত দলিল। চারপাশটা যতই অস্থির হোক না কেন, ডন কার্লোর চুইংগাম চিবানো আর ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্তগুলোই এখন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন