বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ‘রাউন্ড অব ৩২’ এর ম্যাচে জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ দিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডদের পুরোপুরি বোতলবন্দি করে রেখেছিল জাপান। এমনকি ২৯ মিনিটে কাইশু সানোর দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে গোল করে জাপান যখন ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই ব্রাজিলের ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় বদলি খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির চমৎকার গোলটি যেন হাজার হাজার ব্রাজিল ভক্তের হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনে। তবে প্রথমার্ধে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়লেও এই ম্যাচটি ব্রাজিল কখনোই হারতে বসেনি বলে মনে করেন বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলার জাহিদ পারভেজ চৌধুরী। সাবেক এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার বলেন, ‘বিশ্বকাপের মূল পর্বের আবহ সম্পূর্ণ আলাদা এবং ব্রাজিল দল হিসেবে সবসময়ই ফেভারিট। প্রথমার্ধে জাপানি রক্ষণভাগে ব্রাজিলের পাসিং ফুটবল সফল না হলেও তারা দ্রুত কৌশল বদলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। ব্রাজিল দলের প্রধান চালিকাশক্তি আসলে অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলোত্তির সাজানো জাদুকরী ও চমৎকার ট্যাকটিক্যাল কিছু বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলার পরিকল্পনাই ব্রাজিলকে দারুণ জয় এনে দিয়েছে। ব্রাজিল প্রথম ম্যাচের পর দিন দিন ইমপ্রুভ করছে। আমার ধারণা ও বিশ্বাস এই ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলবে।’
জাপানের কড়া রক্ষণের সামনে ব্রাজিলের প্রথমার্ধের খেলাটি বেশ একঘেয়ে ছিল। ২৯ মিনিটে সানোর সেই চিলিং শটে গোল হজম করার পর ব্রাজিল নিজেদের কৌশল দ্রুত বদলে ফেলে। বিরতির পর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে লুকাস পাকেতাকে উঠিয়ে মাঠে এনদ্রিককে নামান আনচেলোত্তি। এতে দলের গতি অনেক বেড়ে যায় এবং ৫৬ মিনিটে ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের উড়ে আসা চমৎকার ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন ক্যাসেমিরো। জাহিদ পারভেজ মনে করেন, মাঠের মাঝখানে ছোট পাসের খেলা না জমায় অভিজ্ঞ কোচ আনচেলোত্তি তাৎক্ষণিকভাবে ‘প্ল্যান বি’ দিয়ে খেলার কৌশল বেছে নেন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্রাজিল খুব দ্রুত নিজেদের খেলার ধরন বদলে ফেলে এবং দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফুটবল খেলেছে।
তাছাড়া ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লীগে রিয়ালের মতো ক্লাবে দীর্ঘদিন কোচিং করানো অভিজ্ঞ আনচেলোত্তি বেশ ভালোভাবেই জানতেন কীভাবে নকআউট ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে হয়।’ ম্যাচে নেইমারকে শুরুতে না খেলানো নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও জাহিদ একে কোচের একটি ‘মাস্টারক্লাস’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। নেইমারের বর্তমান ফিটনেস দলের উচ্চ গতির খেলার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। জাহিদ বলেন, ‘নেইমার বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট খেলার জন্য উপযুক্ত এবং নকআউটের মতো কঠিন ম্যাচে যেখানে ১০ জন খেলোয়াড়কে একযোগে আক্রমণ ও রক্ষণ সামলাতে হয়, সেখানে তার শারীরিক সক্ষমতা কম।’ আধুনিক ফুটবলে শুধু লাতিন শৈলী দিয়ে জেতা সম্ভব নয়, বরং এর সঙ্গে ট্যাকটিক্সের ফিউশন প্রয়োজন যা আনচেলোত্তি করে দেখিয়েছেন।
জাহিদ মনে করেন, আগেকার ব্রাজিলিয়ান কোচরা শুধু গোল দেয়ার মানসিকতা রাখলেও বর্তমান দল আক্রমণে ও রক্ষণে সমানভাবে অংশ নিচ্ছে। অতীতের বিশ্বকাপে যেমন রোনালদো-রিভালদোর পাশাপাশি রোনালদিনহো তৃতীয় শক্তি হয়ে উঠেছিলেন, এই দলেও তরুণরা সেভাবে ভূমিকা রাখছেন। গ্রুপ পর্বের সমীকরণ অনুযায়ী সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে দলটির। তবে বর্তমান আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত মেসিনির্ভর হওয়ায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের ওপর ভর করে ট্রফি জেতা অসম্ভব এবং নকআউটে প্রতিপক্ষের কড়া ডিফেন্সের সামনে তারা বড় ধরনের কঠিন মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জে পড়বে বলে জাহিদ সবসময় দৃঢভাবে মনে করেন। তবে ব্রাজিলের এই দুর্দান্ত জয়ের মধ্যেও কিছু দুর্বলতা চোখে পড়েছে জাহিদের।
বিশেষ করে তাদের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড জোনে প্রতিপক্ষের কুইক কাউন্টার অ্যাটাকগুলো সামলানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের শ্লথগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মরক্কো ও জাপানের বিপক্ষে হজম করা গোলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাঝমাঠের গতিশীল বল মুভমেন্টের সময় ক্যাসেমিরোর রিকভারির গতি কিছুটা কমে গেছে। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারলে ব্রাজিলের অভিনব ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের ‘মিশন হেক্সা’ সফল হবে বলে মনে করেন তিনি।
