ফুটবল বিশ্বকাপ সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। কোনো দেশের কাছে এটি শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে এসেছে ট্রফি জিততে। ১৯৬৬ সালের পর আরেকবার সোনালি ইতিহাস লেখাই তাদের মূল লক্ষ্য। আটলান্টায় আজ রাত ১১টায় শেষ ৩২-এ থ্রি লায়নসরা মুখোমুখি হবে ডিআর কঙ্গোর। যাদের কাছে ফুটবল মানে কিছুক্ষণের জন্য হলেও দুঃখ ভুলে থাকার আশ্রয়। দেশটির পূর্বাঞ্চলে এখনো সংঘাতের ধোঁয়া উড়ে। হাজারো পরিবার যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ায়। এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপের নকআউটে নিজ দেশের পতাকা উড়তে দেখা পুরো জাতির জন্য যেন এক বিরল আনন্দের উপলক্ষ। ৫২ বছর আগে ‘জায়ার’ নামে বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে সামরিক শাসকের হুমকিতে পড়েন কঙ্গোর ফুটবলাররা। অর্ধশতাব্দী পরেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি।
পূর্ব কঙ্গো যুদ্ধ আর মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিকে তাই উপভোগের মঞ্চ বানাচ্ছে কঙ্গো। দেশের মানুষকে একটু হলেও কষ্ট ভুলিয়ে রাখতে চাইছেন ইয়োয়ানে উইসা। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে নকআউটে পাঠানো উইসা বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার যোগ্যতা আমরা অর্জন করেছি। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ভিন্ন একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে। এ ধরনের ম্যাচ উপভোগ করা উচিত। আপনারা জানেন, আমাদের দেশের পরিস্থিতি কেমন। পূর্ব কঙ্গোতে যুদ্ধ চলছিল। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ যখন আমরা জার্সিটা পরি, তাদের কথাই মনে পড়ে। সুতরাং, যা কিছুই হোক আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ গ্রুপ পর্বে ঘানার বিপক্ষে কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়ে ইংলিশ শিবির। গোলশূন্য ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল টমাস টুখেলদের দলকে। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষেও ম্যাচ সহজ হবে না। ইংল্যান্ডের খেলা নিয়ে সন্তুষ্ট নন সাবেক অধিনায়ক রয় কিন। পানামার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ের পরেও সমালোচনা করে বলেন, ‘ইংল্যান্ড হিমশিম খাচ্ছে, তাদের খেলায় প্রয়োজনীয় তীব্রতা নেই। কখনো কখনো তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে তাদের মানেই নেমে যেতে হয়। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।’
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা রাইটব্যাক নিয়ে। একসময় যে পজিশনে বিকল্পের অভাব ছিল না, নকআউটে এসে সেটিই হয়ে উঠেছে থ্রি লায়ন্সদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। রিস জেমস, টিনো লিভরামেন্তো ও জ্যারেল কোয়ানসা- তিনজনই চোটে পড়েছেন। ফলে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে টটেনহ্যামের জেড স্পেন্সকে রাইটব্যাকে খেলাতে হবে। মজার বিষয় হলো, স্পেন্সকে মূলত লেফটব্যাক হিসেবে দলে নেয়া হয়েছিল। দলে কেন ফুলব্যাক নেয়া হয়নি এ নিয়ে ক্ষোভ ঝেরেছেন সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল। ইংলিশদের চোট নিয়ে টমাস টুখেলও উদ্বিগ্ন। জার্মান এই কোচ বলেন, ‘অবশ্যই রাইটব্যাক পজিশন নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এই পজিশনে আমরা আরেকটি চোট পেলাম। রিস জেমস ও জ্যারেল কোয়ানসাকে ফেরানো কঠিন হবে। তবে সমাধান খুঁজে বের করাই আমাদের কাজ।’ ইংল্যান্ডের এই দুর্বলতাকে টার্গেট করবে কঙ্গো। ডানদিকে উইসা এবং বাকাম্বুর গতি কাজে লাগিয়ে গোল আদায় করে নিতে চাইবে দলটি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে উইসাসহ বেশ কয়েকজন কঙ্গোলিজ ফুটবলার রয়েছেন।
যাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে। তিনি বলেন, ‘প্রিমিয়ার লীগে খেলা ফুটবলাররা আমাদের সাহায্য করবে। কিন্তু এমন বড় একটা ম্যাচের জন্য যেকোনো মূল্যে সেরা প্রস্তুতিই নিশ্চিত করতে চাই আমরা।’ ম্যাচের আগে কঙ্গোর জন্য দুঃসংবাদ। যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি দলের সবচেয়ে পরিচিত সমর্থক মিশেল কুকা ম্বোলাদিঙ্গা, যিনি ‘লুমুম্বা ভেয়া’ নামেই খ্যাত। ২০২৫ আফ্রিকান নেশন্স কাপে অদ্ভুত ভঙ্গিতে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পান তিনি। কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক পাত্রিস লুমুম্বার আদলে সাজা এই সমর্থককে দলের ‘দ্বাদশ সদস্য’ মনে করা হয়। কিন্তু অজানা কারণে তাকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ম্যাচে তাই গ্যালারিতে থাকা হচ্ছে না লুবুম্বা ভেয়ার।
