৫২ বছর বয়সী মা মোসা. মমতাজ বেগম। তিনি গত এক বছর ধরে ভুগছেন ব্রেস্ট ক্যান্সারে। ২০২৫ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। তাকে দেখতে চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় ছুটে যান বড় ছেলে মো. জাবের (৩০)। সেখানে যাওয়ার পর শারীরিকভাবে অসুস্থতা বোধ করেন জাবেরও। এরপর তিনিও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জাবেরেরও ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত হয়। একই মাসে এক নির্মম-নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হন মা-ছেলে। শুরু হয় দু’জনের বাঁচার সংগ্রাম। গত এক বছরে মা-ছেলের চিকিৎসা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। তবে নিজে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও নিজের বাঁচার চিন্তা না করে ছেলেকে বাঁচাতে চান মা মমতাজ। মায়েরা হয়তো আসলেই এমনই হন। মমতাজ নিজের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে নিষেধ করছেন সন্তান-স্বজনদের। তিনি চাচ্ছেন তার ছেলে জাবেরই যেন চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এমনই এক করুণ পরিস্থিতির শিকার হওয়া ওই দুই মা-ছেলে ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চতলা (জনতা বাজার) এলাকার হামিদ পাটোয়ারী বাড়ির বাসিন্দা। মমতাজ বেগমের ছোট ছেলে মো. জোবায়ের জানান, ২০২৫ সালের জুন মাসের প্রথম দিকে মায়ের ব্রেস্টে একটি ছোট টিউমার দেখা দেয়। এরপর তাকে দ্রুত ঢাকার একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত তা অপারেশন করা হয়। অসুস্থ মাকে দেখতে চট্টগ্রামে গার্মেন্টেসে চাকরি করা আমার বড় ভাই জাবের ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে যান। তবে সেখানে যাওয়ার পর জাবেরের শারীরিক অবস্থা খারাপ অনুভব করায় তিনিও একটি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সেখানের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত করেন। মায়ের পর ভাইয়েরও ক্যান্সার, এতে করে আমরা পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। তিনি জানান, এ পর্যন্ত মাকে আটটি কেমোথেরাপি এবং পনেরটি রেডিওথেরাপি দেয়া হয়েছে। আর ভাই জাবেরকে প্রথমে দেশে চারটি কেমোথেরাপি দেয়া হয়। তবে এতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভারতের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানের চিকিৎসক ইমিউনোথেরাপি দেয়ার কথা বলেন। অর্থাভাবে সেখানে আর ভাইয়ের চিকিৎসা করা যায়নি। যার জন্য তাকে আবার দেশে ফিরে আসতে হয়। দেশে আসার পর ঢাকার একটি হাসপাতালে তাকে একটি ইমিউনোথেরাপি দেয়া হয়েছে, এখনো আরও তিনটি ইমিউনোথেরাপি দিতে হবে। তবে এখন আর কোনোভাবেই অর্থের জোগাড় করতে পারছি না। কারণ এরইমধ্যে মা এবং ভাইয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসায় ৬৪ শতাংশ জমি বিক্রি করে আর আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। এখন বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পদ নেই। তিনি আরও জানান, বাবা বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবেও অসুস্থ। তিনি এখন কাজ করতে পারেন না। যার জন্য খুব অল্প বয়সেই আমার বড় ভাই জাবেরকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। সুস্থ থাকতে তিনিই গার্মেন্টসে চাকরি করে যা বেতন পেতেন তা দিয়েই সুন্দরভাবে সংসার চালাতেন। এ ছাড়া, আমার ভাইও বিভিন্ন সময় অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করতেন। এখন তিনি নিজেই অসহায় হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে কোনোভাবে অর্থের জোগাড় করতে না পারায় মা বলছেন-আমাকে আর চিকিৎসা করানোর দরকার নেই। আমার বয়স হয়েছে, আমি আর বাঁচবোই বা কতো দিন! সবাই মিলে যেন জাবেরের চিকিৎসাটাই করাই। তা তো আর হয় না, চোখের সামনে মাকেই বা ধুঁকে ধুঁকে কীভাবে মারা যেতে দেখবো। জোবায়ের জানান, এখন মা এবং ভাইয়ের পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে হলে আরও অন্তত ২০ লাখ টাকার দরকার। এত টাকা কই পাবো, এসব নিয়ে পরিবারের সবাই চরম হতাশাগ্রস্ত। তবে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সমাজের বিত্তবান ও দেশ-বিদেশের মানবিক মানুষজনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে হয়তো মা এবং ভাই সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমার মা এবং ভাইয়ের চিকিৎসা ব্যয়ে সহযোগিতা করতে চাইলে ০১৭২৭০১৩৩০৭ এবং ০১৭৯৫০৮০০১৬ এসব নম্বরে যোগাযোগের বিনীত অনুরোধ করছি। এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ বলেন, এটি অত্যন্ত হৃদয় বিদারক ঘটনা। দ্রুত সময়ের মধ্যে জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের যে অনুদান রয়েছে তা যেন তারা পান, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
‘মায়েরা হয়তো এমনই হয়’
হাসান পিন্টু, লালমোহন (ভোলা)
৩০ জুন (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
