২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একত্রে ইরানে হামলা চালালে যে যুদ্ধের সূচনা হয় তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি আটকে দেয়। এতে শতশত সামুদ্রিক জাহাজ ও হাজারো নাবিক এই প্রণালিতে আটকা পরে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপের পরও হরমুজে কার্যকর অবরোধ বজায় রাখে ইরান। এতে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয় মার্কিন পরাশক্তি। আলোচনার টেবিলে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থান এনে দেয় তার হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার এই সক্ষমতা। অচলাবস্থা ভাঙ্গতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান শান্তিচুক্তির সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলে হরমুজ প্রণালিতে স্বস্তি ফেরে। তবে এই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলমান।
শুধু স্নায়ুযুদ্ধই নয় একই সঙ্গে সামরিক সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর। এতে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আবারো স্থবির হয়ে পরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও উভয় পক্ষ উত্তেজনা বাড়াবে না বলে জানিয়েছে তবে যেকোন সময় ফের সংঘাত শুরু হতে পারে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে এখন বিশ্বে চলছে টান উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রথম বৈঠক হয়েছে। ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশ প্রণালিটি পরিচালনার বিষয়ে একটি সাধারণ সমঝোতায় বা যৌথ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। এ খবর দিয়েছে এএফপি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে কাজেম ঘারিবাবাদি জানান, ওমান একটি উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে এই প্রণালির ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা মনে করে যে, প্রণালিতে প্রদত্ত বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ফি বা শুল্ক আদায় করা উচিত। এই লজিস্টিকস ও শিপিং রুট নির্ধারণের জন্য আগামী সাত থেকে আট দিনের মধ্যে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। হরমুজ প্রণালির এই নতুন সেবা শুল্ক নিয়ে আমেরিকার সাথে ইরানের তীব্র মতবিরোধ চলছে; ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের শুল্ক আরোপের ঘোর বিরোধী। এর আগে ওমান জানিয়েছিল যে, তারা কোনো পারাপার ফি বা প্যাসেজ ফি নেবে না এবং জাতিসংঘের সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর তৈরি করবে। যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান তাদের নিজস্ব উপকূলবর্তী রুট ব্যবহারের জন্য জাহাজে হামলা চালিয়ে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।
এদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন সোমবার ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করতে এবং নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচল নিশ্চিত করতে ফ্রান্স ও ওমান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের ফ্রান্স সফরের পর ম্যাক্রন সামাজিক মাধ্যম এক্সে এই ঘোষণা দেন। তবে ফ্রান্সের এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে তেহরান। কাজেম ঘারিবাবাদি এক্সে দেয়া এক পোস্টে স্পষ্ট জানান, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ইরান এককভাবেই হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করার কাজ সম্পন্ন করবে। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ৮০টি মাইন অপসারণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ ইরানের। ঘারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান মাইন অপসারণের এই প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো দেশকে অংশ নিতে দেবে না। একই সাথে তিনি হরমুজ প্রণালির সংবেদনশীল ও জটিল পরিস্থিতিকে ফ্রান্সের এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ দিয়ে আরও জটিল না করার জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছেন। বিশ্বের পরাশক্তিরা চাইছে এই জলপথে নিজেদের প্রভাব থাকুক। অপরদিকে ইরান চাইছে এর কর্তৃত্ব শুধুই তাদের হাতে থাকবে। এতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সহসাই মিটবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোর যত দ্রুত সম্ভব উন্মুক্ত করণে সকল পক্ষকে একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন।
