রাষ্ট্র যতই ধনী ও সম্পদশালী হোক না কেনো একটি রাষ্ট্রে সরকার নাগরিকদের সব করে দিতে পারে না, পারবে না, এটা সম্ভবও নয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিককে তার নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে যেতে হবে। রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধানে জনগণের বিভিন্ন অধিকার ও বিধিনিষেধের ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে। অধিকার লঙ্ঘিত হলে জনগণ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। যেমন সংবিধানে বর্ণিত কোন মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে সংক্ষুব্ধ যে কোনো ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে যথাযথ প্রতিকার চাইতে পারে।
তবে অধিকার ও দায়িত্ব সমান্তরালভাবে (Parallel) চলে। নাগরিকদের অধিকারের ব্যাপারে আইন ও সংবিধানে ব্যাপকভাবে বলা হলেও তাদের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে খুব কমই বলা আছে বা বলা হয়ে থাকে। ফলে অনেক সময় দেখা যায় নাগরিকরা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন। রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রত্যেক নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নাগরিক দায়িত্ব আছে। যেমন: ট্রাফিক আইন ও বিধি মেনে চলা, রাস্তা-ঘাটে যত্রতত্র ময়লা ও আবর্জনা না ফেলা, স্থানীয় ও জাতীয় বিধিনিষেধ ও প্রচলিত আইন মেনে চলা, অন্যকে অসম্মান না করা, অন্যের ক্ষতি হয় রাস্তায় এমন ময়লা-আবর্জনা দেখলে সরিয়ে ফেলা, জাতীয় ও স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য প্রত্যেক নির্বাচনে ভোট দেয়া, প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট না করা, নাগরিকদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা, অন্যের ক্ষতি হয় এমন কাজ পরোক্ষভাবেও না করা ইত্যাদি।
নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে, যা পালন না করলে আইনে যথাযথ শাস্তির বিধান আছে। ফলে আইনের ভয়ে সাধারণত নাগরিকরা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে থাকেন। যেমন ট্রাফিক আইন ও বিধি ভঙ্গ করে গাড়ি চালালে জরিমানা, যত্রতত্র ময়লা ও আবর্জনা ফেললে ফিক্সড পেনাল্টি, প্রতিবেশীর অধিকার ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া ইত্যাদি। আবার কিছু কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পালন না করলে কোন প্যানাল্টি বা শাস্তির বিধান নেই। যেমন: প্রত্যেক নির্বাচনে ভোট প্রদান হচ্ছে প্রত্যেক নাগরিকের নাগরিক দায়িত্ব, তবে এই দায়িত্ব পালন না করলে কোন শাস্তি প্রদান করা হয় না। ঠিক অনুরূপভাবে রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা দেখেও না সরালে কোন শাস্তির বিধান নেই।
উন্নত ও সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকদের নাগরিক দায়িত্ববোধ অত্যন্ত শক্ত ও প্রকট। সেখানে পরিবেশটাও গড়ে উঠেছে সেভাবে। গভীর রাতে রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, পুলিশও নেই, ট্রাফিক ক্যামেরাও নেই, তারপরও ট্রাফিকের লাল বাতিতে গাড়ি থেমে থাকে। রাস্তায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা তো দূরের কথা একটি টিস্যু ব্যবহার করে রাস্তায় না ফেলে বরং পকেটে রেখে দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়। পথ চলাচলে নাগরিকরা অন্যের অধিকার ও সম্মানের ব্যাপারে এতটুকু সচেতন যে কে কোন ড্রেস বা কাপড় পরে যাচ্ছে তাতে চোখ তুলেও তাকায় না। ফুটপাথ দখল বা ব্লক অথবা ফুটপাতে দোকান দেয়া তো দূরের কথা সবাই নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে সব সময় সব জায়গায় ফুটপাত খোলা ও পরিষ্কার রাখে।
কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায় দস্তুরমত পুরো উল্টো। ট্রাফিক লাইটে লালবাতি দেখে দাঁড়িয়ে থাকাকে মারাত্মক দুর্বলতা ভাবা হয়। আর ট্রাফিক লাইটে লালবাতিতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়াকে বাহাদুরি বা বেটাগিরি বলে ভাবা হয়। অবৈধভাবে ফুটপাথ দখল, ব্লক ও আইনের তোয়াক্কা না করে ফুটপাথে দোকান বসিয়ে দেয়াকে গ্রহণযোগ্য ও একেবারে সাধারণ ব্যাপার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ময়লা ও আবর্জনা যত্রতত্র ফেলাকে একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করা হয়। ডাস্টবিন ও ময়লা নির্দিষ্ট স্থানের পরিবর্তে খাল ও নালাতে ফেলাকে গ্রহণযোগ্য ভাবা হয়, অথচ এগুলোর কারণে একদিকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে, অপরদিকে দুর্গন্ধের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
রাষ্ট্র সবাইকে spoon-feed করতে পারবে না। প্রত্যেক নাগরিকের ঘরে ঘরে রাষ্ট্র পুলিশ রাখতে পারবে না তার অধিকার সংরক্ষণের জন্য। রাষ্ট্রের সবকিছু আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণও করা যায় না। আধুনিক রাষ্ট্রে Civil Liberties কনসেপ্টটা খুবই প্রবল। সেই কনসেপ্টটি হলো- every citizen is free to do anything unless prohibited by law (অর্থাৎ আইন দ্বারা নিষিদ্ধ না হলে প্রত্যেক নাগরিক যেকোনো কিছু করতে স্বাধীন)। এই ব্যাপক Civil Liberties ধারণা সম্বলিত সমাজে নাগরিকরা যদি নৈতিক সততা ও উন্নত মূল্যবোধের অধিকারী না হন, তাহলে অতি সহজেই অন্য নাগরিকের অধিকার হরণের কারণ হয়ে দাঁড়াবেন।
যে রাষ্ট্রে নাগরিকদের নৈতিক মান যত উন্নত সে রাষ্ট্রে নাগরিকদের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধও তত উন্নত। উন্নত জাতীয় নৈতিক চরিত্র আইনের চেয়েও শক্তিশালী। আইন দ্বারা রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে দিয়ে সবকিছু করানো যায় না বা করা থেকে বিরত রাখা যায় না। এটা সম্ভব নয়। বরং নাগরিকদের উন্নত নৈতিক চরিত্র ও মূল্যবোধ থাকলে অনেক ভালো ও জনকল্যাণকর কাজ তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করবে রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বা অর্থায়ন ছাড়া। বস্তুত: রাষ্ট্রের নাগরিকদের উন্নত নৈতিক চরিত্র হচ্ছে সে রাষ্ট্রের মূল মূলধন ও শক্তি। বিশিষ্ট দার্শনিক জন লকের ভাষায় ‘The strength of the society lies in the moral integrity of its citizens’ (অর্থাৎ সমাজের শক্তি তার নাগরিকদের নৈতিক সততার মধ্যে নিহিত)।
নাগরিকদের মধ্যে নৈতিক সততা ও উন্নত নৈতিক চরিত্র এমনি এমনি গড়ে উঠবে না। এজন্য দরকার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা, সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা ভোগকারী সরকার বিভিন্ন খাতে বাজেটের টাকা বরাদ্দ করে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের শাস্তি দেয়ার জন্য সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু জাতীয় নৈতিক চরিত্র গঠনে এবং নাগরিকদের মধ্যে নৈতিক সততা বাড়ানোর জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য কোন বরাদ্দ চোখে পড়ে না। অথচ এ খাতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে রাষ্ট্র যা অর্জন করতে পারবে না নাগরিকদের নৈতিক মান উন্নত হলে তা অতি সহজেই অর্জন করা সম্ভব।
নাগরিকদের মধ্যে নৈতিক সততা ও উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনে স্ব স্ব ধর্ম, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ছোট একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) যখন মুসলিম জাহানের খলিফা তথা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, তখন রাষ্ট্রের প্রধান কাজী তথা প্রধান বিচারপতি ছিলেন হযরত ওমর (রা.)। এক বছর পার হলেও হযরত ওমরের (রা.) কোর্টে একটি মামলা পর্যন্ত আসলো না! নৈতিক বলে একটি জাতি কতটুকু বলিয়ান হলে এবং একটি রাষ্ট্রে নাগরিকরা একে অন্যের কতটুকু কল্যাণকামী হলে এমনটি হতে পারে তা কল্পনারও বাইরে।
অনেকে বলতো পারেন শিক্ষা নাগরিকদের মধ্যে এমনিতেই নৈতিক সততা ও উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠন করবে। আলাদা উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতার দরকার নেই। নিকট অতীতের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে এটি নির্দ্বিধায় বলা যাবে যে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এটা করতে অক্ষম। কেননা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে বর্তমান শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এক কলমের খোঁচায় শত শত এমন কি হাজার হাজার কোটি টাকা তসরুপ হচ্ছে, হচ্ছে পাচার। ঐতিহাসিকভাবে বলা হতো ‘ভাত আমাদের জাতীয় খাদ্য’। দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন বোধ হয় অত্যক্তি হবে না এটা বলাতে যে ‘ঘুষ হচ্ছে আমাদের জাতীয় খাদ্য!’ আর এই ঘুষের সাথে জড়িত আছেন আমাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা। এক সময় বলা হতো ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’। এ কথাটা সম্ভবত এখন অচল। এখন সম্ভবত সংশোধন করে বলতে হবে শুধু শিক্ষা নয় বরং ‘সুশিক্ষা বা নৈতিক শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’।
লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার। Email: [email protected]
