ফেব্রুয়ারির শেষে যখন ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু হয়, তখন চীনের নেতারা আরেকটি মিত্র সরকারের নেতৃত্বচ্যুত হওয়ার এক বাস্তব সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ঠিক যেমনটি ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
তবে কয়েক মাস পরেই সেই চিত্র পুরোপুরি পালটে গেছে। ইতিমধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তবে ইরানের সেই সরকারের পতন ঘটেনি বরং এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কারণ দেশটি একের পর এক বিদেশি নেতাদের আতিথেয়তা দিয়েছে এবং নিজেকে শান্তির প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। এমনকি এই যুদ্ধে চীনের প্রতিক্রিয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বারবার প্রশংসাও পেয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকটও তার অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে- বিশেষ করে বিপুল কৌশলগত তেলের মজুদ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন গ্রহণের কারণে।
চলতি সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালনে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।
এই চুক্তিতে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, জানতে চাইলে চীনা মুখপাত্র লিন জিয়ান কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেননি। তবে তিনি যুদ্ধ শেষ করার জন্য চীনের ‘ক্লান্তিহীন’ প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরতেও দ্বিধা করেননি।
গত বুধবার ফ্রান্সে এক জি-৭ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, আমি চীনকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, প্রেসিডেন্ট শি’কেৃ তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, এবং আমি এর প্রশংসা করি।
সিএনএন বলছে, চীনা নেতারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অমান্য করতে তার দেশের নৌ শক্তি ব্যবহার করেননি।
এনিয়ে ট্রাম্প আরও বলেছেন, তারা তা করেনি। প্রেসিডেন্ট শি আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন এবং আমার মনে হয়, তিনি সম্ভবত এর সমাধানেও সাহায্য করেছেন।
সংঘাত চলাকালীন চীন একটি সতর্ক কূটনৈতিক পথ অবলম্বন করেছিল। দেশটি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানায় এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রাখে। তবে দেশটি উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও রেখেছিল।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে বহু বিদেশি নেতা বেইজিং সফর করেছেন– যাদের মধ্যে গত মাসে ট্রাম্প, তার কয়েকদিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সংঘাতের প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারাও রয়েছেন।
শান্তিচুক্তির প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে তেহরান চেয়েছিল, চীন চুক্তির বাস্তবায়নে একজন গ্যারান্টর বা নিশ্চয়তাদানকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করুক। তবে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক ও সম্ভাব্য জটিল দায়িত্ব গ্রহণে বেইজিং খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
গত বুধবার চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ফোনে আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল যথাযথভাবে সামলানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়াং বলেছেন, শান্তির ভোর উদিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরবর্তী ধাপের সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ কতটা আন্তরিকভাবে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে এবং সব ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করতে সক্ষম হয় তার ওপর।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে চীন নেপথ্যে কতটা কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বুধবার একটি সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নির্ধারণে ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে।
সিএনএন বলছে, সংঘাতের সময় বিভিন্ন দেশের নেতাদের দেশটিতে সফর এমন একটি বার্তা তুলে ধরেছে যে, অন্যরা যখন যুদ্ধ করছে, তখন চীন নিজেকে দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি ও প্রভাবশালী শান্তি-মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী আলোচনার পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করছে। এই মুহূর্তে পর্যবেক্ষকেরা গভীরভাবে লক্ষ্য রাখছেন- এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী লাভ করল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি ডেকে এনেছে।
চীনে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল নীতি, সেখানে রাজনৈতিক চিন্তাবিদরাও এই সংঘাত বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, এই সংঘাত কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তথাকথিত ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হয়ে উঠছে কি না- যা ১৯৫০’এর দশকে সুয়েজ খালের ওপর বৃটেনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে।
ওই ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃটেনের আন্তর্জাতিক প্রভাব হ্রাস এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের একটি পূর্বাভাসমূলক মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
শাংহাইয়ে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক সুন দেগাং চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত লেখায় প্রশ্ন তোলেন- সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর যে দৃশ্য ছায়া ফেলেছিল, তা কি এখন হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?
তিনি বলেন, শীতল যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের ‘একক পরাশক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে এবার দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ওয়াশিংটন যেমন ভেবেছিল ততটা সর্বশক্তিমান প্রমাণিত হয়নি, এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অনুপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটব্যবস্থা ক্রমেই বিভক্তির লক্ষণ দেখাচ্ছে।
এই প্রশ্নটি এখন পশ্চিমেও আলোচিত হচ্ছে, তবে চীনে কিছু কণ্ঠ আরও স্পষ্টভাবে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ থেকে বেইজিং কৌশলগতভাবে লাভবান হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের রাজনৈতিক ভাষ্যকার হু শিজিন লিখেছেন, এই সংঘাত বিশ্বে চীনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছে। এটি দেখিয়েছে যে শক্তি সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে চীন কতটা সফল, এবং তার শান্তিপূর্ণ ‘উন্নয়ন পথ’-এর প্রতি আকর্ষণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান সম্পর্কিত সামগ্রিক প্রতিরোধ সক্ষমতাকে “উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল” করেছে। তার মতে, এর মাধ্যমে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা এবং এমনকি এককভাবে বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধেও একটি পূর্ণাঙ্গ পশ্চিমা জোট গঠন করতে তাদের ব্যর্থতা।
হু শিজিনের ভাষায়, এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
