বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
সিএনএনের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেলোনি সম্প্রতি ট্রাম্পের এক দাবিকে সরাসরি অস্বীকার না করে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে ট্রাম্পের প্রতি প্রতীকীভাবে বিরোধিতা প্রদর্শন করা হয় এবং মিত্রদের প্রতি তার আচরণের সমালোচনা যুক্ত করা হয়েছে।
মেলোনি বলেন, আমি শুধু বলতে পারি, পশ্চিমের শত্রুদের ক্ষেত্রে তার (ট্রাম্পের) একই দৃঢ়তা দেখা যায় না, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের ক্ষেত্রেও নয়। বরং যেসব নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি বেশি নমনীয়, তাদের ক্ষেত্রে তার আচরণ ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ট্রাম্পের বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতি বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা। মেলোনি অবশ্য প্রথমবার এমন অবস্থান নেননি।
চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি ট্রাম্পের পোপ চতুর্দশ লিও সম্পর্কিত মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। এর এক মাস আগেই ট্রাম্প তাকে ‘চমৎকার নেতা’ ও বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
জর্জিয়া মেলোনির মতোই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোও ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন। চলতি বছর ট্রাম্প ২০২৫ সালের একটি ভিডিওর প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করেন, যেখানে ব্রিজিত ম্যাক্রোকে তার স্বামীর (ম্যাক্রো) মুখে ধাক্কা দিতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ম্যাক্রোর স্ত্রী তার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেন এবং তিনি এখনও চোয়ালের আঘাত থেকে সেরে উঠছেন। এর জবাবে গত এপ্রিল মাসে ম্যাক্রো বলেন, ট্রাম্পের এসব মন্তব্য শোভনীয় ছিল না এবং তা মানানসইও নয়।
এ ছাড়া প্রায় একই সময়ে ইরান যুদ্ধ মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ম্যাক্রো প্রচ্ছন্ন মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ কোনো লোক দেখানো বিষয় নয়। তিনি ট্রাম্পকে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পকে নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন জার্মান চ্যান্সেলরও। ইরান যুদ্ধ চলাকালে ফ্রিডরিখ মের্ৎস পরোক্ষভাবে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ইরানিরা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোরাচ্ছে।
এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে স্পেনও তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরান সংঘাতকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, ভয়ভীতির কারণে স্পেন কোনো ভুল পদক্ষেপে অংশ নেবে না।
সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি অসন্তোষ আরও আগেই প্রকাশ পেতে শুরু করে। চলতি বছরের শুরুতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ঘিরে ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
এ ছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ডাভোসে দেয়া এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে বলেন, অর্থনৈতিক একীকরণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প বারবার কানাডাকে তাদের অঙ্গরাজ্য হওয়ার আহ্বান জানান।
বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের কিছু মন্তব্যকে অপমানজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেন। পরে তিনি ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বৈদেশিক অবস্থান অনেক দেশের জন্য সরাসরি ‘রেড লাইন’ না হলেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান নতুন করে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এর ফলে একাধিক মিত্র দেশ এখন আরও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাম্প্রতিক মন্তব্যকে এই ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
