বাজেট বাস্তবায়নে প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা: র‌্যাপিড

বাজেট বাস্তবায়নে প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা: র‌্যাপিড

ফন্ট সাইজ:

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পুরো বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রায় চার লাখ কোটি টাকার প্রকৃত ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করছে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে র‌্যাপিড আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট: অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা’ শীর্ষক সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক এ মন্তব্য করেন।

এতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য রুবানা হক, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার এবং র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ইউসুফ এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘যদি সরকার মনে করে তারা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন করবে, তাহলে এই বাজেট ঘাটতি কিন্তু ২ লখ ৪৩ হাজার (বাজেটে লক্ষ্য) থেকে অনেক অনেক বেশি হবে।’

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এনবিআর জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে সেখানে 'অন্ততপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার’ ঘাটতি থেকে যাবে।

"এই বছরে (অর্থবছর ২০২৬-২৭) তাদের 'এক্সট্রাঅর্ডিনারি' রেভিনিউ পারফরম্যান্স যদি হয়, তারপরেও আমাদের ধারণা, এক লাখ কোটি টাকার একটা ঘাটতি কিন্তু হবে। এনবিআরকে যে টার্গেট দেয়া হয়েছে সেটার হিসাবে। "এটা কেন বললাম, আপনারা সবাই জানেন যে এনবিআরের গত দিনগুলোর পারফরম্যান্স কী আছে। প্রত্যেক বছরের বাজেটে সরকার বড় বড় রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেয়, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু এনবিআর আসলে পারে না সেই রাজস্ব সম্পূর্ণ আদায় করতে।"
এর সঙ্গে সরকার যে বিদেশি ঋণ ধরে বাজেট অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেখানেও ৫০ হাজার কোটি

টাকা ঋণ কম মিলবে বলে ধারণা করছেন এম এ রাজ্জাক। তার মতে, "বিদেশ থেকে যে ঋণ নেয়ার কথা বলা হয়েছে, আমরা মনে করি সেই ঋণও পুরাটা পাওয়া যাবে না। আগামী বছরে আমরা খুব ভালো করলেও যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ আনতে পারব এবং আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা, সেটার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার একটা ঘাটতি থাকবে।"

বাজেটে সরকার ঘাটতি পূরণে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

রাজ্জাক বলেন, "সারা বিশ্বে টোটাল বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ অসম্ভব গতিতে নিচে নামা শুরু করেছে। ২০২৩ সালে সারা বিশ্বে ২৩২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্যের ফ্লো ছিল। সেটা কমতে কমতে এখন ১৫৩ বিলিয়ন ডলারে এসেছে।"

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সীমিত আয়ের মানুষ যখন চাপে রয়েছে, তখন ‘স্থিতিশীলতা তৈরি না করে’ সরকার উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য ধরেছে, তা মূল্যস্ফীতি আরও 'উসকে' দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন র‌্যাপিড চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, "আমাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন-আমরা কি স্ট্যাবিলাইজেশনকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি? স্ট্যাবিলাইজেশনে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে যদি কেবল রিকভারি বা গ্রোথকে (প্রবৃদ্ধি) বুস্ট করতে চাই, তবে মূল্যস্ফীতি কমবে না এবং অর্থনীতির স্থিতি অর্জন করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

মূল প্রবন্ধে র‌্যাপিড চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, বাজেটের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিতে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া। এর মাধ্যমে ৪১ লাখ নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেয়া হবে। র‌্যাপিডের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই কার্ড যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্রদের (৪১ লাখ) মধ্যে বিতরণ করা যায়, তাহলে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে কমে ১৩.৮ শতাংশে নেমে আসবে। অর্থাৎ দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমবে। র‌্যাপিডের এম এ রাজ্জাক আরও বলেন, যদি ভবিষ্যতে পরিধি বাড়িয়ে দেশের সব দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনা সম্ভব হয়, তাহলে দারিদ্র্যের হার ১১.৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। অর্থাৎ দারিদ্র্য বিমোচনে বড় হাতিয়ার হতে পারে এই ফ্যামিলি কার্ড।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ বাড়াবে। লাল ফিতার দৌরাত্ম দূর করা হবে ব্যবসা সহজীকরণের জন্য। শিল্পকে নিরাপদ করতে জ্বালানি নিরাপত্তা গড়ে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি করা হবে। তাগিদ দেয়া হবে রপ্তানিতে। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হবে ব্যবসায়ীদের। বন্ধ কলকারখানা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন, অর্থনৈতিক সংকট থেকে কীভাবে মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থা বাড়ার অর্থাৎ ফিসকাল স্পেস তৈরি করার কৌশল হচ্ছে দুটো। একটি হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকোচন থেকে সম্প্রসারণ। সেটি আপনার আয় বাড়িয়ে দেবে। আর আমাদের অপচয় বা জালিয়াতি বা ফাঁকি বা অনিয়ম-দুর্নীতি কমিয়ে দিলে আয় বেড়ে যাবে।

অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে, এটা শুধু প্রভাবশালী পলিসি হিসেবেই থাকবে। আমি মনে করি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নেই, পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের টেনে তুলতে হবে। সরকার বিভিন্ন কার্ড নিয়ে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, শিক্ষায় বড় বাজেট দিয়েছে। কিন্ত সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সুশাসন বজায় রাখা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন