যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকাপ জিততে পারবে!

দ্য আটলান্টিকের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র কী বিশ্বকাপ জিততে পারবে!

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ গোলে জয়ের পর ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট পরে ফিল্ডের টানেলের দিকে হাঁটছিলেন কোচ মরিসিও পোচেত্তিনো লুমেন। চারপাশে চলছিল উৎসবের আবহ, আর তিনি তা গভীরভাবে উপভোগ করছিলেন। স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকদের কেউ লাল-সাদা-নীল রঙের ওভারঅল পরেছিলেন। কেউ তিন কোণাওয়ালা ঐতিহাসিক টুপি ও আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পোশাক পরে এসেছিলেন। কারও গায়ে ছিল বর্তমান দলের লাল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি। আবার কেউ পরেছিলেন ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের স্মৃতি জাগানো ডেনিম-নীল পোশাক। সবাই মিলে গাইছিলেন জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’- উদ্যাপন করছিলেন এমন এক অর্জন, যা ১৯৩০ সালের পর কোনো মার্কিন দল করতে পারেনি।

পোচেত্তিনো আরও কয়েক কদম এগিয়ে থামলেন। তিনি দর্শকদের দিকে হাত নাড়লেন, মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে উদ্যাপন করলেন। এরপর সমর্থকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্লোগান তুললেন- ‘ইউ-এস-এ!’ আর দর্শকরাও সমস্বরে তার জবাব দিলেন।

এটি এমন এক সমর্থকগোষ্ঠী, যারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে- শুধু শুক্রবার স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরাই নন, বরং সারা দেশের কোটি কোটি মানুষও। আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে টানা দুটি ম্যাচ জিতেছে। বহুদিন ধরে ‘সোনালি প্রজন্ম’ হিসেবে পরিচিত খেলোয়াড়রা অবশেষে নিজেদের সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখাতে শুরু করেছে। আর যে দল বরাবরই দাবি করেছে যে তারা বিশেষ কিছু করতে সক্ষম, তাদের নিয়েই এখন মানুষ বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

ম্যাচ শেষে পোচেত্তিনো বলেন, আমাদের বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং প্রথম দিন থেকে যেভাবে এগিয়েছি, ঠিক সেভাবেই প্রতিটি দিনকে গ্রহণ করতে হবে- এই বিশ্বাস নিয়ে যে আমরা জিততে পারি। আমরা জানি, আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে একই সঙ্গে একসঙ্গে কাটানো সময় উপভোগ করতে হবে এবং প্রতিদিন নিজেদের যাত্রাপথ গড়ে তুলতে হবে। আমার স্বপ্ন খুব একটা বদলায়নি। ভালো খেললে এবং ম্যাচ জিতলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। আগে আমরা বলতাম, একটি ম্যাচ, তিন পয়েন্ট। এখন সেটা দুই ম্যাচ, ছয় পয়েন্ট। আর আমাদের পরবর্তী ম্যাচটিও জয়ের লক্ষ্যেই খেলতে হবে।

অবশ্য দুটি জয়ের পর অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়া সহজ। ফুটবলের সাধারণ বাস্তবতা বলে, বিশ্বকাপের শিরোপা সাধারণত সেই কয়েকটি অভিজাত দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কিন্তু সিয়াটলের সমর্থকদের কিংবা সেই লাখো সাধারণ দর্শককে এটা বোঝানো কঠিন, যারা উপলব্ধি করছে যে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন সত্যিই দারুণ আনন্দের ব্যাপার।
ম্যাচ শেষে ফক্স টেলিভিশনে সাবেক সুইডিশ তারকা স্ট্রাইকার জুলাতান ইব্রাহিমোভিচকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কি বিশ্বকাপ জিততে পারে? তিনি এক শব্দে উত্তর দেন- হ্যাঁ।

একবার এই বাক্যটি নিয়ে ভাবুন। তারপর আবার মাথা নেড়ে নতুন করে চিন্তা করুন।
যুক্তরাষ্ট্র যেন বিশেষ কিছু করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ তারা এমন দুটি প্রতিপক্ষকে হারিয়েছে, যাদের হারানোর কথা ছিলই। প্রথমে সহজেই প্যারাগুয়েকে পরাজিত করেছে, এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন এক ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে প্রতিপক্ষ শারীরিক লড়াই দিলেও ফুটবলীয় চ্যালেঞ্জ খুব বেশি দিতে পারেনি।

হ্যাঁ, এটি মাত্র দুটি জয়। কিন্তু তবুও তারা এখন গ্রুপে তিন পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে তারা পশ্চিম উপকূলে থেকেই শেষ ষোলোর ম্যাচ খেলতে পারবে এবং সিয়াটলের শক্তিশালী ঘরের মাঠের সুবিধা আবারও পেতে পারে।
সবকিছুই আলাদা মনে হচ্ছে। বড় মনে হচ্ছে। কারণ সবকিছু ঘটছে নিজেদের দর্শকদের সামনে, যারা আমেরিকান ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় দেখতে চায় এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে মাঠে দলের পাশে দাঁড়িয়েছে। খেলোয়াড়রাও বলছেন, তারা সেই সমর্থন অনুভব করছেন। এটি একমুখী সম্পর্ক নয়। দর্শক ও খেলোয়াড়দের মধ্যে আবেগের আদান-প্রদান হচ্ছে। এ কারণেই ম্যাচ শেষে সাধারণত স্থির চরিত্রের অধিনায়ক টিম রিম দলীয় বৃত্তে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

রিম বলেন, সত্যি বলতে কী, আমার সঙ্গে কী ঘটেছিল, আমি নিজেও জানি না। সম্ভবত সবকিছুরই প্রভাব ছিল। আমরা শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করেছি, সেটা হঠাৎ করে অনুভূত হয়েছে। হয়তো পরিবারের সদস্যরা স্ট্যান্ডে বসে ম্যাচ দেখছিলেন, হয়তো আমরা সবাই কত পরিশ্রম করেছি আর তার প্রতিদান পাচ্ছি- এসব ভাবনা একসঙ্গে এসে আমাকে আবেগাপ্লুত করে ফেলেছিল। আমি সাধারণত আবেগপ্রবণ মানুষ নই, কিন্তু এবার আবেগ আমাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

রিমের জন্য, তার নেতৃত্বাধীন দলের জন্য, স্টেডিয়ামের দর্শকদের জন্য এবং টেলিভিশনের সামনে থাকা কোটি মানুষের জন্য শুক্রবারের রাতটি যেন ছিল দীর্ঘদিনের চাপমুক্তির মুহূর্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খারাপ ফল হলে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া গতি থেমে যেত। কিন্তু এই মার্কিন দল আরেকটি জয়ের মাধ্যমে নিজেদের আত্মবিশ্বাস আরও শক্তিশালী করেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে সেই স্মরণীয় দর্শকসমুদ্রের সমর্থনে, যারা ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত গেয়ে এবং শেষ বাঁশির পর জন ডেনভারের গান গেয়ে খেলোয়াড়দের রোমাঞ্চিত করেছে।

ডিফেন্ডার অস্টন ট্রাস্টি বলেন, এটি আপনাকে গভীর জাতীয় গর্বে ভরিয়ে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়, আপনি আসলে কাদের জন্য খেলছেন। আপনি নিজের জন্য খেলছেন, পরিবারের জন্য খেলছেন, আপনার আশপাশের মানুষের জন্য খেলছেন, কিন্তু একই সঙ্গে পুরো দেশের জন্য এবং আমেরিকান ফুটবলের জন্যও খেলছেন।

প্রথম দুটি বিশ্বকাপ ম্যাচে প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক সমর্থন ও ইতিবাচক। জুলাতানের এক শব্দের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল সেই উচ্ছ্বাসের আরেকটি শিরোনাম মাত্র। গত চার বছরে মার্কিন পুরুষ ফুটবল দলের চারপাশে ইতিবাচক, উদ্যাপন ও আশাবাদ খুবই বিরল ছিল। তাই খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ জয়ের আলোচনা হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন, যদিও তা অনেক আগেভাগেই শুরু হয়েছে। যদিও সামনে বেলজিয়াম, স্পেন ও ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নকআউট পর্বে অপেক্ষা করতে পারে। বিশ্বকাপ জয় করা অত্যন্ত কঠিন কাজ; ইতিহাসে মাত্র আটটি দেশ এই কৃতিত্ব অর্জন করেছে।

সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকেও নিজের প্রথম বিশ্বকাপ জিততে পাঁচবার চেষ্টা করতে হয়েছে। আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল, আর ১৯৩০ সালের পর সেটিই তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ নকআউট জয়। এবারের দলকে সেই সাফল্যের সমান হতে হলেও আরও একটি অতিরিক্ত নকআউট ম্যাচ জিততে হবে।

তবুও কেন এই মুহূর্ত উপভোগ করা হবে না?
আর কেনই বা বিশ্বাস করা হবে না যে বিশেষ কিছু করা সম্ভব?
মিডফিল্ডার ওয়েস্টন ম্যাককেনি বলেন, আমেরিকার ভিত্তিই গড়ে উঠেছে বিশ্বাসের ওপর। আমরা নিজেদের কাছ থেকে সেটাই প্রত্যাশা করি। বাইরের মানুষ কী বলছে, তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা সবসময় নিজেদের ওপর এবং একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখব।

পোচেত্তিনো বলেছেন, এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো শিথিল না হয়ে পড়া এবং প্রশংসার জোয়ারে ভেসে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম থেকে সরে না আসা। তিনি বলেন, আমাদের আনন্দ করতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হবে এবং নিজেদের আরও ভালো করতে কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে।

স্থায়ী উত্তরাধিকার তৈরি করাই শুরু থেকেই দলের লক্ষ্য ছিল। শুধু কেউ যেন বলে, তারা বিশ্বকাপ জিততে পারে- তা নয়; বরং মানুষকে সত্যিকারের বিশ্বাস করার মতো কারণ উপহার দেওয়া।

শুক্রবার সিয়াটলে আরেকটি জয়ের পর সেই বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে খেলোয়াড়রা জানেন, কাজ এখনো অনেক বাকি। তারা গোটা দেশকে নিজেদের পাশে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু এই মার্কিন দল তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় হতে নয়, ইতিহাস গড়তে চায়। আর ইতিহাস গ্রুপ পর্বের জয়ে লেখা হয় না; সেটি লিখতে হয় টুর্নামেন্টের আরও পরের ধাপে।

ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই শিখেছি, ইতিহাসে বিজয়ীরাই স্মরণীয় হয়ে থাকে। আমি জানি, পুরো দেশ আমাদের সমর্থন করছে এবং প্রতিটি ম্যাচে আমাদের নিয়ে গর্ব করছে। আমরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিছু করছি। কিন্তু আমার লক্ষ্য শুধু একটাই- ট্রফি জেতা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন