মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ওয়াশিংটন-তেল আবিব দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মিত্রতায় যে টানাপড়েন চলছিল, তা এখন খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। গত বৃহস্পতিবার খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মুখে ইসরাইলকে নিয়ে যে কড়া ও রূঢ় ভাষা শোনা গেছে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে তা স্পষ্টতই এক প্রচ্ছন্ন হুমকি। আর এই হুমকিই ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইসরাইলের চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসন স্পষ্টতই আশঙ্কা করছে যে, ইসরাইল ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি চুক্তি নস্যাৎ করে দিতে পারে যাকে অনেকে ইরানীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক বলে মনে করছেন। শুক্রবার ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ পুনরায় একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে সিএনএন-কে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর আগে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এবং ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনাকে আবারো ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল।
কেন এই সম্পর্কচ্ছেদ: ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরাইলের লক্ষ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল এবং এতে ইসরাইলের স্বার্থ ছিল অনেক বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ইতিমধ্যেই বেশ ক্ষুণ্ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে । এমনকি, তীব্র ইসরাইল পন্থী রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও সম্প্রতি অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং দলের সমর্থকদের মাঝে বাড়তে থাকা ইহুদি-বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিলেও বছরের পর বছর ধরে তিনি বিভিন্ন ইহুদি-বিদ্বেষী বক্তব্যও দিয়েছেন। এছাড়া ট্রাম্প সাধারণত মিত্রদের সাথে কেবল তখনই ভালো আচরণ করেন, যখন সেটি তার নিজের স্বার্থে আসে। এখন ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত চিৎকার করে বলছে, আমরা আপনাদের যা দিয়েছি তা নিয়েই আপনাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত। অন্যথায় এর পরিণতি ভালো হবে না। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সেই ‘অন্যথায়’ বা চরম পদক্ষেপের দিকে যাবে কি না তা এখনো দেখার বিষয়। তবে রিপাবলিকান পার্টিও যে ইসরাইলের সাথে সম্পর্কের একটি চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই এক অভাবনীয় ঘটনা।
ভ্যান্সের মন্তব্য : বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ভ্যান্সের করা মন্তব্যগুলো ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, ডনাল্ড জে. ট্রাম্পই বর্তমান সময়ে সমগ্র বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরাইল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র শক্তিশালী যে মিত্র অবশিষ্ট আছে, হয়তো তার ওপর আক্রমণ করতাম না। এরপর ভ্যান্স বারবার এই ধারণার দিকে ফিরে আসেন যে ইসরাইলের এখন সতর্কতার সাথে চলা উচিত।
তিনি উল্লেখ করেন যে ইসরাইল আমেরিকান অস্ত্রের ওপর কতটা নির্ভরশীল এবং কিছু ইসরাইলি নেতার এখন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করা উচিত। এর আগে বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারেও ভ্যান্সের কন্ঠে একই সুর শোনা গিয়েছিল। সেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসরাইলকে এটি মনে করিয়ে দিতে বলেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি চমৎকার অংশীদার ছিল এবং মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কীভাবে ইসরাইলিদের রক্ষা করেছে তা উল্লেখ করেন। তিনি লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান কমিয়ে আনারও পরামর্শ দেন, যা এই ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশের উদ্দেশ্যে ভ্যান্স বলেন, আপনাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যার সমাধান আপনারা শুধু নির্বিচারে হত্যা করেই করতে পারেন না।
ট্রাম্পের মন্তব্য: ভ্যান্সের এই শেষ মন্তব্য মূলত ট্রাম্পেরই প্রতিধ্বনি, যিনি নিজেই বেশ কয়েকবার ইসরাইলের আচরণকে অত্যন্ত কঠোর ও বেপারোয়া বলে চিত্রায়িত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চলতি মাসের শুরুতে স্বীকার করেছেন যে তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননে ইসরাইলের আচরণের কারণে ‘পাগল’ বলেছিলেন। ট্রাম্প এক্সিওস’কেও জানিয়েছেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে সরাসরি সতর্ক করেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, আমি বলেছিলাম, বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম), তোমার সতর্ক হওয়া উচিত, অন্যথায় খুব শীঘ্রই তোমাকে একা হয়ে যেতে হবে। ১৪ই জুনের মধ্যে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৈরুতে ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি হওয়া উচিত হয়নি এবং হিজবুল্লাহর যে হামলার জবাবে এটি করা হয়েছিল তা ছিল খুবই ছোট ও অর্থহীন। এরপর গত মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির সাথে আলাপকালে ট্রাম্প ইসরাইলের আরও তীব্র সমালোচনা করেন।
ট্রাম্প বলেন, আপনি যখন কাউকে খুঁজছেন, তখন প্রতিবার একটি পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ ওইসব অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে অনেক মানুষ থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়। এটি আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি। ইসরাইলের সাম্প্রতিক প্রতিশোধমূলক হামলাকে তিনি ‘অতিরিক্ত’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না থাকতৃ তবে ইসরাইলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। ইসরাইল পৃথিবীর বুক থেকে ১০০ ভাগ মুছে যেত। এবং ইসরাইলের প্রতিটি বুদ্ধিমান মানুষই এই সত্যটি জানে। যদিও ভ্যান্সের মন্তব্যগুলোই সবার মনোযোগ কেড়েছে, তবে ট্রাম্পও প্রায় একই ধরনের কঠোর বার্তা দিয়ে আসছিলেন।
ইসরাইল-মার্কিন সম্পর্কের একটি সংকটময় মুহূর্ত: অবশ্য এসবের মানে এই নয় যে ট্রাম্প এবং ইসরাইলের মধ্যে এখনই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে যাচ্ছে।
শান্তি আলোচনার মাঝে অসন্তুষ্ট ইসরাইলকে লাইনে রাখার আশ্বাসে এখানে হয়তো কিছুটা কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এবং হয়তো এটি কাজও করবে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি মারাত্মক সংঘর্ষের পর শুক্রবার ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ নতুন করে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানকে বাগে আনার জন্য অন্য দেশগুলোকে পাশে পাওয়ার এই বিরল সুযোগটি হাতছাড়া না করতে এবং এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায় করে নিতে ইসরাইল ও নেতানিয়াহুর বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে। তারা স্পষ্টতন ট্রাম্প প্রশাসনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রশাসন কেবল চাইছে এই যুদ্ধ যেন দ্রুত শেষ হয়। তাই ইসরাইল যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন করে তুলবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
তবে এসব বিষয় পাশে রাখলেও, ট্রাম্প এবং ভ্যান্স যে ভাষায় কথা বলছেন তা সত্যিই নজিরবিহীন। ইসরাইলের বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো যে, গাজা যুদ্ধে তাদের আচরণ অনেক বেশি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। এমনকি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন কমিশনসহ অনেকেই এটিকে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেই যখন বলেন যে ইসরাইল অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছে, তখন এই ধারণাটি বিশ্বজুড়ে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে। মিত্রদের সাথে, বিশেষ করে ইসরাইলের সাথে আচরণ করার ক্ষেত্রে এটি প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি পথ। এটি সত্য যে ট্রাম্প প্রায়শই মিত্রদের সাথে ব্যবসায়িক স্বার্থের ভিত্তিতে ভালো কিংবা খারাপ আচরণ করেন। কিন্তু ইসরাইলের সাথে জোটের বিষয়টি সবসময় আলাদা ছিল। নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে তাকে বিরক্ত করলেও ট্রাম্প এই জোটকে সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায় পবিত্র মনে করতেন।
তবুও বৃহস্পতিবার ইসরাইলকে নিয়ে ভ্যান্স যেভাবে কথা বলেছেন, তা গত বছর ওভাল অফিসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি তাদের করা আচরণের কথাই মনে করিয়ে দেয় যখন তারা বলেছিলেন, আপনি কি একবারও ধন্যবাদ জানিয়েছেন? উভয় ক্ষেত্রেই, ট্রাম্প এবং ভ্যান্স একটি যুদ্ধ শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে নেয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করায় মিত্রকে তার সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে এই ক্ষেত্রে, পরিস্থিতি আমেরিকার কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ জোটের সম্পর্ককে ওলটপালট করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।
