তাইপের একটি ছোট এবং ভিড়ে ঠাসা ঘরে প্যান চিয়েন-চিন একটি ড্রোনকে বাতাসে স্থিরভাবে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। নিজেকে একটি বিমানের পাইলট কল্পনা করে তিনি আলতো করে কন্ট্রোলারের জয়স্টিক চেপে পোকার মতো দেখতে এই যন্ত্রটিকে বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে কখনো ড্রোন না ওড়ানো প্যান যখন কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই ট্রাফিক চিহ্নিত একটি চারকোণা পথ ধরে ড্রোনটিকে ঘুরিয়ে আনলেন, তখন চারপাশ থেকে উল্লাস ভেসে এলো। তার চারপাশে থাকা আরও প্রায় ২৪ জন প্রশিক্ষণার্থী একই কোর্সে অংশ নিয়েছেন, যা তাইওয়ানের ইতিহাসে প্রথম বেসামরিক প্রতিরক্ষা ড্রোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ৪৮ বছর বয়সী কর্মী প্যান বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ড্রোনের ব্যবহার পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আসলে নিজেকে আরেকটি দক্ষতায় পারদর্শী করে তোলা, যা ভবিষ্যতে কোনোদিন প্রয়োজন হলে কাজে লাগানো যাবে। গত মে মাসে শুরু হওয়া এই দূরদর্শী কর্মসূচিটি তাইওয়ানের বেসামরিক প্রতিরক্ষা আন্দোলনের আরেকটি বড় উদাহরণ। ২০২২ সাল থেকে রুশ আগ্রাসন রুখে দিতে ইউক্রেনে ড্রোন যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়েই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানে জরুরি উদ্ধারকাজ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণের একটি জোয়ার দেখা গেছে, যার ফলে বর্তমানে ৩০টিরও বেশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী বেসামরিক প্রতিরক্ষা গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
এই প্রশিক্ষণ পরিচালনাকারী বেসামরিক প্রতিরক্ষা এনজিও ‘কুমা একাডেমি’র মুখপাত্র ট্যাং সুং-ই বলেন, এই কোর্সটি একদম নতুন ড্রোন চালকদের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের কার্যক্ষমতা বুঝতে সাহায্য করে। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির মুখে থাকা তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মধ্যে ড্রোনের বিষয়ে সচেতনতা ও জ্ঞান বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাইওয়ানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে সেখানে নিবন্ধিত ড্রোনের সংখ্যা ৩৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৪ সালে ড্রোন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বয়স কমিয়ে ১৪ বছর করা হয়েছে। এমনকি তাইপের কিছু উচ্চ বিদ্যালয়ে গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পের আয়োজন করে শিক্ষার্থীদের ড্রোন তৈরি করা এবং উদ্ধারকাজে তার ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। কুমা একাডেমির এই ড্রোন চালনা কোর্সের আগস্ট পর্যন্ত সব স্লট এরই মধ্যে বুক হয়ে গেছে। এখানে প্রতি মাসে প্রায় ৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব।
শনিবার বিকেলে প্যানের প্রথম ক্লাসে এক বৈচিত্র্যময় দল অংশ নিয়েছিল। সেখানে দুই কিশোরের পাশাপাশি ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা ছিলেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী ক্যারেন ওয়াং বলেন, আমার এই বয়সে কোনো সংকটের সময়ে অবদান রাখার জন্য ড্রোন ওড়ানোই হতে পারে অন্যতম সেরা উপায়। প্রথমবার ড্রোন ওড়ানোর অভিজ্ঞতাকে ‘মন্দ নয়’ উল্লেখ করে তিনি দলের সহযোগী পরিবেশের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ড্রোনটি মারাত্মকভাবে আছড়ে পড়লেও সবাই বলছিল, দারুণ করেছ। গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলা পাঁচ প্রশিক্ষণার্থীই স্থানীয় বেসামরিক প্রতিরক্ষা গ্রুপের অন্যান্য প্রশিক্ষণ যেমন প্রাথমিক চিকিৎসা এবং আহতদের সরিয়ে নেয়ার কাজে অংশ নিয়েছেন। এবার ড্রোনের প্রশিক্ষণ যুক্ত হওয়ায় প্রতিরক্ষা দলগুলো এমন এক ক্ষেত্রে প্রবেশ করল যা তাইওয়ানের নিরাপত্তার জন্য দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসনের সময় দেশটির পাহাড়ি অঞ্চলে সম্মুখভাগের নজরদারির জন্য এই ড্রোনগুলো বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। ইউক্রেনে ড্রোন চালকেরা প্রতিদিন হাজার হাজার আক্রমণাত্মক মিশন পরিচালনা করছেন। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, রুশ বাহিনীর হতাহতের ৬০ ভাগের জন্যই ড্রোন দায়ী।
ট্যাং জানান, এই কোর্সের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা নয়, বরং তারা যেন শুধু আশ্রয় কেন্দ্রে লুকিয়ে থাকার মতো নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষা থেকে বেরিয়ে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য শেয়ার করার মতো সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন। সরকারি সম্পর্কযুক্ত একটি প্রতিরক্ষা সংস্থায় কাজ করার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, আমি হয়তো সৈনিক নই, কিন্তু এখানে যদি কখনো চীনের আক্রমণ ঘটে, তবে একজন নাগরিক হিসেবে আমি কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করার ক্ষমতা রাখতে চাই। ক্লাসে ব্যবহৃত ১০০ গ্রামের চেয়েও হালকা এই ড্রোনগুলো সম্পূর্ণ তাইওয়ানে তৈরি, যেগুলোতে কোনো জিপিএস বা স্বয়ংক্রিয় চালনা প্রযুক্তি নেই। কারণটি খুবই সাধারণ। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের কারণে স্বয়ংক্রিয় বাণিজ্যিক ড্রোনগুলো অকেজো হয়ে পড়তে পারে, তাই চালকদের নিজস্ব দৃষ্টি এবং হাতের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ড্রোন ওড়ানো শিখতে হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তটি ড্রোন সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘চীন-মুক্ত’ একটি বৈশ্বিক চেইন গড়ে তোলার তাইওয়ানিজ প্রচেষ্টার সাথেও মিলে যায়। তবে বিরোধী দল নিয়ন্ত্রিত আইনসভায় সম্প্রতি পাস হওয়া একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেটে দেশীয় ড্রোন উৎপাদনের তহবিলটি বাদ দেয়া হয়েছে। তাইওয়ান কিছু অস্ত্র নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি করলেও বড় বড় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তারা এখনো মার্কিন অস্ত্র ক্রয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
গত মাসে বেইজিংয়ে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজে এখনো স্বাক্ষর করেননি। প্যানের মতো সাধারণ তাইওয়ানিজ নাগরিকদের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা বেসামরিক প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়ার ইচ্ছাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্যান বলেন, আমরা বাইরের পরিবেশকে বদলে দিতে পারব না, তাই একমাত্র যা করতে পারি তা হলো নিজেদের যথাসম্ভব প্রস্তুত রাখা।
সূত্র: গার্ডিয়ান
