গর্ভাশয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুখবর

কার্যকর টীকা

গর্ভাশয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুখবর

ফন্ট সাইজ:

ইংল্যান্ডে সার্ভিকাল ক্যানসার বা গর্ভাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে ব্যবহৃত একটি ভ্যাকসিনের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে বিখ্যাত ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে। প্রথমবারের মতো পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টীকা দেয়ার পর এই বয়সী নারীদের মধ্যে সার্ভিকাল ক্যানসারে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সার্ভিকাল ক্যানসারে কোনো মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়নি। যা পাঁচ বছরের সময়সীমায় প্রথমবারের মতো ঘটেছে।

এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
ভ্যাকসিন না দেয়া হলে এই সময়ে প্রায় ২৩টি মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যাশিত ছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষণার প্রধান প্রফেসর পিটার সাসেনি বলেন, একটি মাত্র টীকা একটি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারকে প্রায় নির্মূল করে দিতে পারে। এটা ভাবতেই অবিশ্বাস্য লাগে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা ১২ বা ১৩ বছর বয়সে এই টীকা পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়সের আগেই এই রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। টীকা কর্মসূচি শুরুর আগে প্রতি বছর এই বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হতো। বৃটেনে এখনো সার্ভিকাল ক্যানসার নারীদের মধ্যে ১৪তম সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। প্রতি বছর প্রায় ৩৩০০ জন এতে আক্রান্ত হন। ধারণা করা হয়, এই ক্যানসারের ৯৯ শতাংশই এইচপিভি ভাইরাসের কারণে হয়, যা ত্বক-সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়।

বেশিরভাগ এইচপিভি সংক্রমণ নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটায় এবং পরে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। গবেষকরা আশা করছেন, আরও বেশি মানুষ টীকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং টীকাপ্রাপ্ত প্রজন্ম বয়সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুহার আরও কমবে। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে এই গবেষণায় অর্থায়ন করেছে। তারা এটিকে অসাধারণ একটি মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছে। তবে তারা সতর্ক করেছে যে ইংল্যান্ডে টীকা গ্রহণের হার এখনো প্রত্যাশিত মানের নিচে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল বলেন, আমরা জানি এইচপিভি ভ্যাকসিন ক্যানসার শুরু হওয়ার আগেই এটি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এই ফলাফল প্রথমবারের মতো দেখাল যে এটি জীবন বাঁচাচ্ছে।

অ্যালেক্সান্দ্রা লেগ স্কুল শেষ করেছিলেন ঠিক সেই সময়, যখন ইংল্যান্ডে এইচপিভি ভ্যাকসিন চালু হয়নি। ২০২১ সালে, যখন তিনি বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ৩০ বছর বয়সে তার সার্ভিকাল ক্যানসার ধরা পড়ে। তিনি বলেন, ডায়াগনসিসের কথা শুনে আমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিলাম না। খুব কষ্ট হয়েছিল- সবকিছু। মাথা ঘুরছিল। তার চিকিৎসায় পেটের লিম্ফ নোড অপসারণ করা হয়, তবে সার্জনরা তার সার্ভিক্সের একটি অংশ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হন, যার ফলে তার গর্ভধারণের সুযোগ থাকে। এক বছর পর তার কন্যা আইভি জন্ম নেয়। তার মধ্যনাম রাখা হয় ‘মারভেলা’, যার অর্থ ‘অলৌকিক’। তিনি বলেন, গর্ভাবস্থার ওই নয় মাস আমি ভয়ে ছিলাম, কারণ যেকোনো সময় সন্তান হারানোর ঝুঁকি ছিল। অ্যালেক্সান্দ্রা বলেন, তার জীবন হয়তো অনেক কম কষ্টকর হতে পারত যদি তিনি এইচপিভি ভ্যাকসিন পেতেন এবং তিনি সবাইকে এটি গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, আমি এই ভ্যাকসিনের একজন বড় সমর্থক। আমার মেয়ে যখন বড় হবে, সে অবশ্যই প্রথম দিকেই এই টীকা পাবে।

কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ক্যানসার এপিডেমিওলজির বিশেষজ্ঞ প্রফেসর পিটার সাসেনি বলেন, ভ্যাকসিন চালুর পর মৃত্যুহ্রাস কেবল বরফখণ্ডের চূড়ামাত্র। তিনি বলেন, যেমন টীকাপ্রাপ্ত প্রজন্ম বড় হবে, আমরা সার্ভিকাল ক্যানসার থেকে আরও অনেক জীবন রক্ষা হতে দেখব। তিনি আরও বলেন, এইচপিভি টীকার কভারেজ যত বেশি হবে, তত বেশি মানুষ সুরক্ষিত থাকবে।

বৃটিশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে সার্ভিকাল ক্যানসারকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, টীকা গ্রহণের হার এখনো লক্ষ্যমাত্রার নিচে। ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ইংল্যান্ডে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে ৭৬ শতাংশ মেয়েকে টীকা দেয়া হয়েছে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৯০ শতাংশ লক্ষ্য থেকে অনেক কম। ক্যানসার রিসার্চ ইউকের প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল বলেন, যেসব এলাকায় টীকা গ্রহণের হার সবচেয়ে কম, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, টীকা কর্মসূচির পাশাপাশি ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী নারীদের নিয়মিত সার্ভিকাল স্ক্রিনিং করানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে ছেলেদেরও এইচপিভি টীকা দেয়া শুরু হয়েছে, যা তাদের মুখ, গলা, লিঙ্গ ও মলদ্বারের ক্যানসার থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ জানিয়েছে, এই গবেষণা এইচপিভি টীকার অসাধারণ প্রভাব প্রমাণ করেছে। এক মুখপাত্র বলেন, আমরা টীকা গ্রহণের হার বাড়াতে কাজ করছি, যাতে আরও বেশি তরুণ এই জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষা পেতে পারে। এর মধ্যে কমিউনিটি ফার্মেসির মাধ্যমে ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচিও চালু করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, যেসব নারী এখনও স্ক্রিনিংয়ে আসেননি, তাদের জন্য এইচপিভি স্ব-পরীক্ষার কিট পাঠানো হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন