যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে শান্তিচুক্তিতে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তান। এ জন্য পাকিস্তানি নেতারা প্রশংসায় ভাসছেন। প্রাথমিক শান্তিচুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। এই চুক্তিতে পৌঁছাতে পাকিস্তানের অব্যাহত, ধৈর্য ও অসাধারণ ভূমিকার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বৃটিশ হাই কমিশনার জেন ম্যারিয়ট। একই কারণে পাকিস্তানের প্রতি গভীর প্রশংসা ও অভিবাদন জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিটসু মোটেগি। চুক্তিতে ভূমিকা রাঝার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। এই চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ এবং সেখান থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন- লেবানন, গাজা ও সিরিয়ায় তাদের অভিযান বন্ধ হবে না। তবে বিশ্বজুড়ে শান্তিচুক্তির ঘোষণাকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাব্য পথ হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকা শুরু থেকেই কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমন এবং সংঘাতের সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ আশা করে, সব পক্ষ সদিচ্ছার সঙ্গে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করবে এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই প্রমাণিত হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প রোববার তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও! ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বিস্তৃত একটি চূড়ান্ত চুক্তি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়কালে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এটিকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একে স্বাগত জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষের দৃঢ় সংকল্প এবং আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতপার্থক্য নিরসনে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করছে। প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলআজিজ আল-খুলাইফি বলেন, তিনি আশা করেন এই চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং অবশিষ্ট সমস্যাগুলোর দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক সমাধানের জন্য আরও বৃহত্তর প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তিনি কাতার, সৌদি আরব এবং তুরস্ককে এই চুক্তি সম্পাদনে অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান। চুক্তি ঘোষণার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেন, অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যকর থাকলেও ইসরাইল লেবাননে দখল করা এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
তিনি বলেন, ইসরাইল লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে। কাটজ আরও হুঁশিয়ারি দেন, লেবাননে হামলার জেরে ইরান যদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইসরাইল প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে জবাব দেবে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিকে ইসরাইল এবং সমগ্র মুক্ত বিশ্বের জন্য খারাপ বলে মন্তব্য করেন। এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান ইতিমধ্যে ইরানকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে বহু সাফল্য অর্জন করেছে এবং সেই অর্জনগুলো ব্যর্থ হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আমাদের নিজেদের উদ্যোগে এবং সৃজনশীল উপায়ে এই অভিযান চালিয়ে যেতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তিকে আমি আমাদের অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছি এবং আমি একে সন্তোষের সঙ্গে স্বাগত জানাই। তিনি আরও বলেন, তুরস্ক হিসেবে আমরা আমাদের অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও প্রশান্তি প্রতিষ্ঠার সব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে যাব এবং কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখব।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই চুক্তিকে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুক্তির দ্রুত এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার দ্বারও উন্মুক্ত করবে।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার এই চুক্তিকে যুদ্ধ অবসানের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে এখন শুল্কমুক্ত নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রয়োজন হলে মাইন অপসারণ কার্যক্রমেও আমরা সহায়তা দিতে প্রস্তুত। স্টারমার এক্সে লিখেছেন, যে কোনো শান্তি দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতিগুলোকে শক্তিশালী, যাচাইযোগ্য এবং পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক। তিনি আরও বলেন, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না- এটি বৃটেনের দীর্ঘদিনের এবং দৃঢ় অবস্থান।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা শুল্ক ছাড়াই সামুদ্রিক চলাচল পুনরায় চালু হওয়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। ম্যাক্রন আরও বলেন, প্যারিস লেবাননের কর্তৃপক্ষের সেই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে, যার লক্ষ্য রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তার মতে, এর মাধ্যমেই লেবাননের স্থিতিশীলতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জনগণের প্রয়োজন নিশ্চিত করা সম্ভব।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি পুনরুজ্জীবিত বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আরও নিরাপদ মধ্যপ্রাচ্যের পথ উন্মুক্ত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
