আবারও প্রশংসায় ভাসছেন জাপান ফুটবল দলের সমর্থকরা। তারা প্রমাণ দিয়েছেন জাতি হিসেবে কতটা উন্নত তারা। আমরা যখন রাস্তাঘাটে, যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি, সেখাতে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের দলের ম্যাচ দেখতে গিয়ে আবারও নজির স্থাপন করেছে তারা। তাদেরকে ‘দ্য রিয়েল হিরোস অব ওয়াল্ডকাপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে অনলাইন ডেইলি মেইল। টেক্সাসের ডালাসে হাজারো জাপানি সমর্থক তাদের দেশের বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে অংশ নিতে যাওয়ার আগেই সঙ্গে নিয়েছিল বর্জ্য ফেলার ব্যাগ। ‘সামুরাই ব্লু’ দলটি রোববার উষ্ণ তাপমাত্রার মধ্যে এয়ার-কন্ডিশনড এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে। টেক্সাসে এদিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।
খেলাটি ছিল বেশ সতর্ক ও কৌশলনির্ভর। ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটি ছিল দৃষ্টিনন্দন। এটি ছিল জাপানের অষ্টম বিশ্বকাপ আসরের দারুণ শুরু। তবে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, জাপানের সমর্থকরাও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। প্রায় ৬,০০০ মাইল দূরে ডালাসে গিয়ে জাপানি সমর্থকরা শত শত বর্জ্য ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে যান। ম্যাচ শেষে অনেক সমর্থক দীর্ঘ সময় ধরে স্টেডিয়ামে থেকে পড়ে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করেন। খেলার আগে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, শত শত জাপানি সমর্থক আমেরিকান শহরের রাস্তায় মার্চ করে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন এবং হাতে ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করছেন। তখন খেলোয়াড়রা ওয়ার্ম আপ করছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল ভক্তরা জাপানিদের প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন।
অনেকেই তাদের ‘ক্লাসি’ এবং ‘সম্মানজনক’ বলে অভিহিত করেন। একজন লিখেছেন, ‘ক্লাস কখনও হারায় না। স্কোরলাইন যা-ই হোক না কেন, জাপান প্রতিটি টুর্নামেন্টেই মাঠের বাইরে জয়ী। তাদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা।’ আরেকজন লিখেছেন, তাদের মধ্যে এতটাই শালীনতা আছে- এমন দেশ খুব কমই দেখা যায় যারা সবসময় শান্ত থাকে এবং ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়। অন্য একজন শুধু লিখেছেন, আমাকে জাপানে নিয়ে যাও। অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলা।
তবে জাপানিরা শুধু বড় আসরেই এই রীতি অনুসরণ করে না। গত মার্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচের পরও সমর্থকরা প্রায় এক ঘণ্টা স্টেডিয়ামে থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করেন। তখন ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের আসন থেকে কফির কাপ, চিপসের প্যাকেট এবং মিষ্টির মোড়ক সংগ্রহ করতে দেখা যায় তাদের। ওই ঘটনায় ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট শুধু একটি বার্তা দেয়: ‘ধন্যবাদ’।
এর ৪ বছর আগে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও জার্মানির বিপক্ষে ২-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের পর জাপানি সমর্থকরা মাঠ পরিষ্কার করেন। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে জয়ের পরও তারা সারান্সকের মর্ডোভিয়া অ্যারেনা পরিষ্কার রেখে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন। এই রীতি ধীরে ধীরে একটি প্রবণতায় পরিণত হয়, পরে সেনেগালের সমর্থকদেরও পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর মাঠ পরিষ্কার করতে দেখা যায়।
জাপানের খেলোয়াড়রাও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। জার্মানির বিপক্ষে জয়ের পর সমর্থকরা গ্যালারি পরিষ্কার করার সময় জাতীয় দলও ড্রেসিং রুম একেবারে পরিষ্কার অবস্থায় রেখে যায়। এমনকি জাপানি ও আরবি ভাষায় ধন্যবাদ লেখা অরিগামি রাজহাঁসও রেখে যায়। জাপানে পরিচ্ছন্নতা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়। ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্কট নর্থ ২০১৮ সালে বিবিসিকে বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জাপানি জীবনধারার প্রতি গর্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম। তিনি বলেন, এটি শুধু ফুটবল সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং জাপানি সংস্কৃতিরই অংশ। ফুটবল আসলে সংস্কৃতির প্রতিফলন- এই কথাটি অনেকেই বলেন। জাপানি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সবকিছু সম্পূর্ণ পরিষ্কার রাখা এবং এটি সব খেলাধুলার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিশেষ করে ফুটবলে।
তিনি আরও বলেন, ম্যাচ শেষে পরিষ্কার করা স্কুলের আচরণেরই সম্প্রসারণ, যেখানে শিশুদের নিজস্ব শ্রেণিকক্ষ ও করিডর পরিষ্কার করতে শেখানো হয়। শৈশব থেকেই নিয়মিত এই শিক্ষা দেয়ার ফলে এসব আচরণ অধিকাংশ মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়।
