ফুটবল প্রেমীদের অনেকেরই মনে হয়তো এখনো দাগ কেটে আছে সেই দৃশ্য—দিদিয়ের দ্রগবা, কোলো তুরে কিংবা ইয়ায়া তুরের মতো বিশ্বমানের তারকারা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আর আইভরি কোস্ট হয়ে উঠছে বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’। দেখতে দেখতে এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে আফ্রিকান ফুটবলের সেই সোনালী প্রজন্মের বিদায়ের। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ বিশ্বকাপেই শেষবার বিশ্বমঞ্চে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল দ্রগবা-তুরেদের।
ঠিক একইভাবে ইকুয়েডর ফুটবল বলতেই একটা সময় চোখে ভেসে উঠতো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি উইঙ্গার আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়ার মুখ। তিনিও আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন প্রায় ৭ বছর হতে চলল। দুই দলই এখন মাঠের লড়াইয়ে নামছে তাদের নতুন প্রজন্মের ওপর ভর করে।
ইতিহাস আর বর্তমানের শক্তিমত্তার বিচারে দুই দলের পার্থক্যটা বেশ স্পষ্ট। মাত্র দুই বছর আগে (২০২৪ সালে) নিজেদের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (AFCON) জিতেছিল আইভরি কোস্ট। তবে সেই টুর্নামেন্টে মাঝপথে কোচ বরখাস্ত করা এবং নাটকীয়ভাবে ট্রফি জেতার পেছনে ট্যাকটিক্যাল শ্রেষ্ঠত্বের চেয়ে আবেগ আর ভাগ্যের জোরই বেশি ছিল। বর্তমান দলটিতে দারুণ কিছু ব্যক্তিগত প্রতিভা থাকলেও দ্রগবা আমলের সেই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো অতিমানবীয় শক্তি এখন আর এই আফ্রিকান শিবিরে নেই।
অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলে ইকুয়েডর সব সময়ই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা উরুগুয়ের মতো পরাশক্তিদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকে। তবে এবারের চিত্রটা ভিন্ন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ইকুয়েডর দলটি তাদের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এবং সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। আগে যারা কেবল নিজেদের ঘরের মাঠের উচ্চতার (Altitude) সুবিধা নিয়ে বাছাইপর্ব পার হতো, সেই ইকুয়েডর এখন ইউরোপের শীর্ষ লিগ কাঁপানো তরুণদের নিয়ে গড়া এক শক্তিশালী দল। পিয়েরো হিংকাপি, উইলিয়ান পাচো আর মাঝমাঠের ইঞ্জিন মইসেস কাইসেদোর ওপর ভর করে লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিদের চোখ রাঙাতে পুরোপুরি প্রস্তুত তারা।
ফিলাডেলফিয়ার মাঠে আজ তাই লড়াইটা শুধু দুটি দেশের নয়; লড়াইটা অতীত ঐতিহ্যকে ফিরে পাওয়ার লড়াই বনাম নতুন এক সোনালী প্রজন্মের ইতিহাস গড়ার মিশন।
মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই রেফারি বদল
ম্যাচ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় খবর হলো রেফারি প্যানেলের পরিবর্তন। এই ম্যাচে বাঁশি মুখে নামার কথা ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞ রেফারি মাইকেল অলিভারের। কিন্তু হ্যামস্ট্রিংয়ের সামান্য চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি ছিটকে গেছেন। অলিভারের পরিবর্তে ফিফা ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে ফ্রান্সের খ্যাতনামা রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে-কে। ইউরো ২০২৪-এর ফাইনাল এবং সদ্য সমাপ্ত মৌসুমের ইউরোপা লিগ ফাইনাল পরিচালনা করা ৩৭ বছর বয়সী লেতেক্সিয়ের এটিই ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। অলিভারের সাথে মাঠ ছাড়তে হয়েছে তার দুই ব্রিটিশ সহকারীকেও, যাদের জায়গায় যোগ দিচ্ছেন ফরাসি লাইনসম্যান সিরিল মুনিয়ের ও মেহেদি রাহমুনি।
আইভরি কোস্ট একাদশ:
আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের একাদশে বড় ধাক্কা ডিফেন্ডার ইভান এনডিকার চোট। হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে আজ মাঠের বাইরে থাকছেন তিনি। ফিফার অফিশিয়াল পজিশন ব্রেকডাউন অনুযায়ী আইভরি কোস্ট আজ ৪-২-৪ নামক এক চরম আক্রমণাত্মক ছক নিয়ে নামছে, যদিও ধারণা করা হচ্ছে ফরোয়ার্ড লাইনে থাকা চারজনের মধ্যে একজন মাঝমাঠে নেমে এসে সাহায্য করবেন।
গোলরক্ষক: ইয়াহিয়া ফাফানা
রক্ষণভাগ: গিসলাইন কোনান, উইলফ্রেড সিঙ্গো, গুয়েলা দুয়ে, ইমানুয়েল আগবাদু
মধ্যমাঠ: সেকো ফাফানা, ফ্রাঙ্ক কেসি (অধিনায়ক)
আক্রমণভাগ: ইয়ান দিওমান্দে, এলি ওয়াহি, নিকোলাস পেপে, বাজুমানা তুরে
ইকুয়েডর একাদশ:
ল্যাটিন আমেরিকার দল ইকুয়েডর আজ প্রথাগত রক্ষণাত্মক শক্তির পাশাপাশি আক্রমণভাগেও ধার বাড়িয়েছে। কাফ ইনজুরির কারণে অধিনায়ক এনার ভ্যালেন্সিয়ার খেলা নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও, সব শঙ্কা উড়িয়ে শুরুর একাদশে ফিরছেন এই অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে চেলসির তারকা মইসেস কাইসেদোর পায়ে।
গোলরক্ষক: হার্নান গালিন্দেজ
রক্ষণভাগ: পিয়েরো হিংকাপি, জোয়েল ওর্ডোনেজ, উইলিয়ান পাচো
মধ্যমাঠ: অ্যালান মিন্দা, পেড্রো ভিতে, অ্যালান ফ্রাঙ্কো, মইসেস কাইসেদো
আক্রমণভাগ: জন ইয়েবোয়াহ, এনার ভ্যালেন্সিয়া (অধিনায়ক), গঞ্জালো প্লাটা
টানটান উত্তেজনার এই ম্যাচে ইকুয়েডরের ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগের সামনে পরীক্ষা দিতে হবে আইভরি কোস্টের চার ফরোয়ার্ডকে। ফিলাডেলফিয়ার সবুজ গালিচায় শেষ হাসি হাসবে কারা—ল্যাটিন ডিফেন্স নাকি আফ্রিকান আক্রমণ? উত্তর মিলবে কিছুক্ষণের মধ্যেই!
টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘ডার্কহর্স’ হিসেবে এবার উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছে ইকুয়েডর।কনমেবল (CONMEBOL) অঞ্চলের কঠিন বাছাইপর্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তারা মূল পর্বের টিকিট কেটেছে।বাছাইপর্বের ১৮ ম্যাচে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ৫টি, যা তাদের রক্ষণভাগের অবিশ্বাস্য ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তারই প্রমাণ দেয়।
ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবে খেলা তারকাদের নিয়ে গড়া ইকুয়েডরের এই আধুনিক ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলটি যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই হুমকি। রক্ষণে উইলিয়ান পাচো এবং পিয়েরো হিংকাপির মতো বিশ্বমানের ডিফেন্ডারদের পাশাপাশি মাঝমাঠের দখল সামলাবেন চেলসির তারকা মিডফিল্ডার মইসেস কাইসেদো।আক্রমণভাগে যথাসময়ে গোল বের করে আনার কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও, নিজেদের ডিফেন্সিভ মাস্টারক্লাস দিয়ে আসরে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে ল্যাটিন আমেরিকার এই দলটি। ফিলাডেলফিয়ার মাঠে আজ তাদের এই জমাট রক্ষণ ভাঙাই হবে আইভরি কোস্টের মূল চ্যালেঞ্জ।
