বোনকে দেয়া কথা রাখছেন দিওমান্দে

আবিদজানের রাস্তা থেকে বিশ্বকাপ

বোনকে দেয়া কথা রাখছেন দিওমান্দে

ফন্ট সাইজ:

আবিদজানের তপ্ত সিকোগি এলাকার ধুলোবালি ও কঠিন পাথুরে রাস্তা। এক জোড়া ভালো জুতো বা বুট কেনা ছিল চরম বিলাসিতা। সেই রাস্তায় স্যান্ডেল পরে কিংবা খালি পায়ে ফুটবল খেলতো এক শিশু। ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য আর একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করা সেই ছেলেটিই এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আকর্ষণ। তিনি আইভরি কোস্টের ১৯ বছর বয়সী ফুটবলার ইয়ান দিওমান্দে। জার্মান ক্লাব লাইপজিগে আলো ছড়ানো এই উইঙ্গারকে ঘিরে এবার বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে আইভরি কোস্ট। তবে তার এই তারকাখ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বুক যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা আর বোনকে দেয়া এক করুণ প্রতিজ্ঞার গল্প।
ছোটোবেলাতেই দিওমান্দের বাবা ফ্রান্সে চলে যান। এরপর আবিদজানের ছোট্ট এক কামরায় অনেক সদস্যের সঙ্গে অভাবের সংসারে বড় হতে থাকেন তিনি। কিন্তু দিওমান্দে বুঝতে পেরেছিলেন, দারিদ্র্যের এই বৃত্ত থেকে মুক্তি পেতে ফুটবলই তার একমাত্র উপায়। মাত্র ১০ বছর বয়সে মায়ের কোল ছেড়ে সম্পূর্ণ একা এক দূরবর্তী ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেন তিনি।

সেখানে বুট ছাড়া খেলা এই প্রতিভাকে প্রথম চিনে নেন একাডেমির পরিচালক বাম্বা। দিওমান্দের কাছে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বাবার মতো। তিনিই প্রথম এই খুদে ফুটবলারকে থাকার জায়গা দেন এবং এক জোড়া আসল বুট কিনে দেন। এরপর দিওমান্দের জীবন আবর্তিত হতে থাকে শুধু একটা ফুটবলকে কেন্দ্র করেই। এরপরের গল্পটা আরও কঠিন। ইংরেজি না জানা এক কিশোর হিসেবে সম্পূর্ণ একা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান দিওমান্দে, কারণ পরিবারের কেবল একটা বিমানের টিকিট কাটারই সামর্থ্য ছিল। ফ্লোরিডায় গিয়ে তীব্র একাকীত্বের মুখোমুখি হন তিনি। একটা মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে ইংরেজি শেখার পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেন। দিওমান্দে পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমেরিকার সেই সময়টা আমাকে এতটা একা থাকতে শিখিয়েছে যে, এখন মনে হয় আমি সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিতে পারবো।’

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্প্যানিশ ক্লাব লেগানেস থেকে যখন তার ইউরোপে খেলার ডাক আসে। ঠিক চুক্তি স্বাক্ষর করার আগে দিওমান্দের জীবনে দুঃখের সংবাদ হয়ে আসে ছোট বোনের মৃত্যু। শোকে মুহ্যমান দিওমান্দে বোনকে দেওয়া সফল হওয়ার প্রতিজ্ঞা পূরণ করতেই ইউরোপে পাড়ি জমান। স্পেনের মাঠে এসপানিওলের বিপক্ষে নিজের প্রথম পেশাদার গোলটি করার পর হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। দিওমান্দে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল বোনকে খুশি করা। এখন আমার কাছে স্বপ্নের সবকিছু আছে, কিন্তু তা ভাগ করে নেওয়ার জন্য ও পাশে নেই।’ সেদিন থেকেই প্রতিটি গোল তিনি উৎসর্গ করেন প্রয়াত বোনকে। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পের বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন পূরণ ও ম্যাচ শেষে তার সঙ্গে জার্সি বদল করাটাও দিওমান্দের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। স্পেনে মাত্র ছয় মাস আলো ছড়ানোর পরই ২০ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অঙ্কে জার্মান ক্লাব রেড ভুল লাইপজিগ দলে ভেড়ায় এই আইভরিয়ান রত্নকে। বুন্দেসলিগায় এসেই তাঁর আসল বিস্ফোরণ ঘটে। গত মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ৩৬ ম্যাচে অংশ নিয়ে একাই ২৩টি গোলে অবদান রাখেন (১২ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট)।

তার চিতার গতি আর দুর্দান্ত ড্রিবলিং দেখে লাইপজিগ কোচ ওলে ভের্নার বলেছিলেন, ‘সে ড্রিবলিং ছাড়াই শুধু নিজের শারীরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারে।’ মাত্র দেড় বছরেই বাজারে দিওমান্দের মূল্য এখন তার ক্রয়মূল্যের তিনগুণ (প্রায় ৬০ মিলিয়ন ইউরো)। লিভারপুল, রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা পিএসজির মতো জায়ান্ট ক্লাবগুলো তাকে দলে নিতে কোটি কোটি ডলারের প্রস্তাব নিয়ে টেবিলে বসে আছে। তবে আইভরি কোস্টের জাতীয় দলের হয়ে ৯ ম্যাচে ৩ গোল করা এই তরুণ খ্যাতির আলোয় অন্ধ হয়ে যাননি। একসময় অনুশীলনের পর ক্ষুধা মেটাতে মাঠের পাশে ভুট্টা চুরি করা সেই ছেলেটি এখনো মায়ের মুখে হাসি ফোটানো এবং পরিবারের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বড় করে দেখেন। আইভরিয়ান কিংবদন্তি ফ্রাঙ্ক কেসিয়েও এই বিস্ময়বালকের ওপর আস্থা রেখে বলেছেন, ‘ইয়ান দিওমান্দের মতো প্রতিভা দলে থাকলে পুরো দেশ শান্তিতে ঘুমাতে পারে।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন