সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বিশাল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করেছে। তবে এত বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন আবারো সামনে এসেছে। এটি এক বছরে এডিপি’র আকারে ১ লাখ কোটি টাকার বৃদ্ধি। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এ ধরনের বড় বৃদ্ধি আগে দেখা যায়নি। অন্যদিকে বাস্তবায়নের গতি এখনো ধীর।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত ২ লাখ কোটি টাকার এডিপি’র মধ্যে প্রথম নয় মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। এই বিশাল উন্নয়ন বাজেটের লক্ষ্য হলো অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। বাজেট নথি অনুযায়ী, এডিপি’র বড় অংশ অর্থায়ন করা হবে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানের মাধ্যমে। দেশীয় উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে নিট ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। যার মধ্যে প্রকল্প ঋণ ও অনুদান হিসাবে ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন হলোÑএই অর্থ কতোটা কার্যকরভাবে ব্যয় করা যাবে। সাম্প্রতিক তথ্যও আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার কমার পাশাপাশি প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে।
যে খাত যত বরাদ্দ পাচ্ছে: নতুন এডিপিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্পের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) ৮০টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ১৫টি খাতের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। এ ছাড়া, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন এডিপিতে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন, পর্যটন, নীল অর্থনীতি, সবুজ প্রবৃদ্ধি এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও অন্যান্য আরও ৫৯ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ খাতে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কৃষি ও পানি উন্নয়ন: স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৭ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। এ ছাড়াও এ খাতে অন্যান্য ৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ৫৩ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা।
জ্বালানি অবকাঠামো: বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ১৪ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা এবং জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের বরাদ্দ ২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এ খাতে মোট বরাদ্দ ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
যোগাযোগ অবকাঠামো: রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। সেতু বিভাগের বরাদ্দ ২ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া এ খাতে অন্যান্য ১০ হাজার ৩২ কোটি টাকাসহ মোট ৪৯ হাজার ১১১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
এ চারটি বিভাগে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এ ছাড়াও আরও ৫১ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা অন্যান্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সর্বমোট এডিপিতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
