মূল্যস্ফীতিকে ভালোবাসেন ট্রাম্প

মূল্যস্ফীতিকে ভালোবাসেন ট্রাম্প

ফন্ট সাইজ:

মূল্যস্ফীতিকে ভালোবাসেন বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনান্ড ট্রাম্প। গত তিন বছরের মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিলো যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার পর ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের (বিএলএস) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মে মাসে আমেরিকার বাজারে পণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ৪.২ ভাগ বেড়েছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৩.৮ ভাগ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। মূলত কোনো অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং ইরান সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি ভালোবাসছি। এই সংখ্যাগুলো দুর্দান্ত। আপনি জানেন আমি আসলে কী পছন্দ করি? আমি মূল্যস্ফীতিকে ভালোবাসি।’ তবে ট্রাম্পের দাবি, যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই এই বাড়তি দাম ‘পাথরের মতো ধপাস করে নিচে নেমে আসবে’। এই মন্তব্যের পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করে।

ইরানের তেল এবং ট্রাম্পের আশ্বাস: মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী রাতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ইরান থেকে ‘লক্ষ লক্ষ ব্যারেল’ তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা হলেও কমেছে। ট্রাম্প বলেন, এই সংঘাত শেষ হলে আপনারা দেখতে পাবেন তেল আগের জায়গায় ফিরে গেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আইওয়া সফরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেখানে তিনি প্রতি গ্যালন পেট্রোল ১.৮৫ ডলারে বিক্রি হতে দেখেছেন এবং খুব শিগগিরই আমেরিকা আবার সেই অবস্থায় ফিরে যাবে। তবে বিশ্ব মিডিয়ার খবরে জ্বালানির দাম ২ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য পরে ট্রাম্প ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তার বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধ সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে ‘অনেক কম’ তিনি মূলত এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন।

জনসাধারণের নাভিশ্বাস ও রাজনৈতিক চাপ: আমেরিকায় টানা তিন মাস ধরে ‘কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স’ (সিপিআই) বা ভোক্তা মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী। ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর তীব্র আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প অবশ্য একে ‘সাময়িক’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন রেগুলার পেট্রলের গড় দাম ৪.১৫ ডলার, যা গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ২.৯৮ ডলার। ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এই রুটটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে হাহাকার চলছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

বিরোধীদের তোপ: সামনে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটারদের কাছে এই মুহূর্তে প্রধান মাথাব্যথার কারণ অর্থনৈতিক মন্দা। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে হাতিয়ার হিসেবে লুফে নিয়েছেন বিরোধীরা। সিনেটের ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, জনগণের প্রতি তার অবজ্ঞা ও উপহাসের কোনো সীমা নেই। এর আগে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মার্কিন জনগণের আর্থিক সংকটের বিষয়টি তাকে ‘বিন্দুমাত্র’ প্রভাবিত করে না। এদিকে মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন ঘোড়া মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (ফেড)-এর নতুন গভর্নর কেভিন ওয়ারশের জন্যও বড় পরীক্ষা। সাধারণত মূল্যস্ফীতি বাড়লে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে ফেড সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এতে ঋণ নেয়া কঠিন হয় এবং খরচ কমে, যা পরোক্ষভাবে পণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করে। ট্রাম্প এর আগে বিদায়ী ফেড প্রধান জেরোম পাওয়েলকে সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফেড সুদের হার আরও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক শীর্ষ অর্থনীতিবিদ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন